সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬

সেপ্টেম্বরে সড়কে ঝরল ৪২৩ প্রাণ,প্রতিদিন গড়ে ১৪ মৃত্যু

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • ২০২৬-১০-০৪ ১৯:১২:৩২

সেপ্টেম্বর মাসে সারা দেশে ৪৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪২৩ জন নিহত এবং ৬৭৪ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ মাসটিতে প্রতিদিন গড়ে ১৪ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। দুর্ঘটনার সংখ্যার পাশাপাশি প্রাণহানির এই চিত্র দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরছে।
রোববার (৪ অক্টোবর) সেপ্টেম্বর মাসের সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম,বিভিন্ন বৈদ্যুতিন মাধ্যম এবং সংস্থাটির নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী,সেপ্টেম্বরে মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ১৫৪টি ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৩৯ জন, যা মোট প্রাণহানির ৩৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। একই সময়ে যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৩ জন,যা মোট নিহতের ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ।
দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ১৭৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে আঞ্চলিক সড়কে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে ১৪৫টি, শহরের সড়কে ৬৩টি এবং গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানো সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। এমন ১৬৮টি দুর্ঘটনায় মোট দুর্ঘটনার ৩৮ শতাংশ ঘটে। এ ছাড়া ১০৯টি দুর্ঘটনায় পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়া হয়েছে, যা মোটের ২৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯৮টি এবং পেছন থেকে আঘাতের ঘটনায় ৬১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যান্য কারণে ঘটেছে ছয়টি দুর্ঘটনা।
যানবাহনভিত্তিক প্রাণহানির হিসাবেও মোটরসাইকেল এগিয়ে। সেপ্টেম্বরে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী ১৩৯ জন,তিন চাকার যানবাহনের ৮৮ জন,বাসযাত্রী ২৬ জন এবং মাইক্রোবাস,ব্যক্তিগত গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ২১ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও ট্রলির ১৯ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের ১৮ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন।
দুর্ঘটনায় মোট ৬৯১টি যানবাহন সম্পৃক্ত ছিল। এর মধ্যে ১৬২টি মোটরসাইকেল, ১২৯টি তিন চাকার যান, ১১৩টি বাস, ৯৩টি ট্রাক এবং ৪৬টি অজ্ঞাত যানবাহন রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন, কাভার্ডভ্যান, পণ্যবাহী ছোট যান, ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল।
বিভাগের হিসাবে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন। মোট দুর্ঘটনার ২৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং মোট প্রাণহানির ৩১ দশমিক ৬৭ শতাংশই এই বিভাগে। চট্টগ্রামে ১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ প্রাণহানি এবং খুলনায় ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনা ও ১৪ দশমিক ৪২ শতাংশ প্রাণহানি ঘটেছে।
একক জেলা হিসেবে গাজীপুরে সবচেয়ে বেশি ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় সেপ্টেম্বরে ৫২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ২০টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত হয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে বিভিন্ন পেশার মানুষও রয়েছেন। প্রতিবেদনে দুই পুলিশ সদস্য, একজন সেনা সদস্য, ১৩ জন শিক্ষক, তিনজন সাংবাদিক, দুই চিকিৎসক, চার প্রকৌশলী, একজন কাস্টমস কর্মকর্তা, একজন বিদেশি নাগরিক, ব্যাংক-বীমার ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী, ১৮ এনজিও কর্মী ও ২৪ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া ৫৮ জন শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পেশার আরও অনেকে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন।
সময়ভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরে সকালে সবচেয়ে বেশি ২৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুপুরে ২১ দশমিক ২৬ শতাংশ, বিকেলে ১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ, রাতে ১৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ভোরে ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরে ১১টি নৌদুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত ও চারজন নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানো দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং চালকদের আচরণগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি পথচারী নিরাপত্তায় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল, তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালনা, ট্রাফিক আইন না মানা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকেও দুর্ঘটনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।
সড়ক নিরাপত্তা জোরদারে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন,বিআরটিএ,বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার,আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার, রাজধানীতে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাসসেবা, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ এবং চালকদের ন্যায্য বেতন, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি, সড়ক নিরাপত্তা


এ জাতীয় আরো খবর