মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬

বেপরোয়া গতি রুখতে চাই কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন

  • তামান্না মিজান
  • ২০২৬-০৯-১৫ ১১:২১:২৬

সড়কে বের হয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারা এখনো অনেকের জন্য নিশ্চিত বিষয় নয়। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছেন, আহত হচ্ছেন। দুর্ঘটনায় একজন মানুষ মারা গেলে ক্ষতি শুধু সেখানেই শেষ হয় না। একটি পরিবার তার উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারায়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। গুরুতর আহত ব্যক্তির চিকিৎসার খরচও অনেক পরিবারের জন্য দীর্ঘস্থায়ী বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো আমাদের অজানা নয়। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অদক্ষ চালনা, মানসম্মত হেলমেটের অভাব, সড়কের নকশাগত ত্রুটি এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা—সব মিলেই ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে দুর্ঘটনা কমাতে হলে শুধু দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নিলে হবে না; যে কারণগুলো দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়, সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) হিসাবে, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। নিহতদের অর্ধেকের বেশি পথচারী, সাইকেল আরোহী ও মোটরসাইকেল আরোহীর মতো ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারী। বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সড়কে মোটরসাইকেল ও পথচারীর উপস্থিতি বেশি, এই বাস্তবতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ সম্পর্কেও WHO-এর তথ্য উদ্বেগজনক। Bangladesh Road Safety Country Profile 2023 অনুযায়ী, ২০২১ সালে দেশে ৫ হাজার ৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু রিপোর্ট করা হয়েছিল। একই বছরের জন্য WHO-এর মডেলভিত্তিক অনুমান ছিল ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু। রিপোর্ট করা ও অনুমিত সংখ্যার এই বড় পার্থক্য সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখায়।
দেশীয় হিসাবেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০২৫ সালে দেশে ৭ হাজার ৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৩৫৯ জন নিহত এবং ১৬ হাজার ৪৭৬ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৭১ জন। মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা তাই সড়ক নিরাপত্তার আলোচনায় আলাদা গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
অতিরিক্ত গতি কমানো জরুরি
সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো গতি। যানবাহনের গতি যত বাড়ে, চালকের সামনে কোনো ঝুঁকি দেখা দিলে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় তত কমে যায়। সংঘর্ষ ঘটলে আঘাতের তীব্রতাও বেড়ে যায়। বিশেষ করে পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহীদের ক্ষেত্রে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
WHO গতি ব্যবস্থাপনাকে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও গুরুতর আঘাত কমানোর অন্যতম কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে। তাই সব ধরনের সড়কের জন্য একই ধরনের গতিসীমা নির্ধারণ করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। সড়কের ধরন, যানবাহনের ঘনত্ব, পথচারীর চলাচল এবং আশপাশের পরিবেশ বিবেচনায় গতিসীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কম গতিসীমা কার্যকর করা জরুরি। এসব এলাকায় গতিসীমা মানা হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে স্পিড ক্যামেরা ও নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা করলে চালকের ওপর নজরদারি যেমন বাড়বে, তেমনি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিনির্ভরতার সুযোগও কমবে।
হেলমেট মানসম্মত হওয়া চাই
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাতের ঝুঁকি বেশি। তাই হেলমেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে শুধু পরা হয়েছে কি না, সেটি দেখলেই হবে না। হেলমেটটি মানসম্মত কি না এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, সঠিকভাবে হেলমেট ব্যবহার করলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি ছয় গুণেরও বেশি কমতে পারে এবং মস্তিষ্কে আঘাতের ঝুঁকি ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে হেলমেটের জাতীয় মানদণ্ড রয়েছে। কিন্তু বাজারে নিম্নমানের ও নকল হেলমেটের উপস্থিতি থাকলে শুধু আইন করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। মানসম্মত হেলমেটের সহজলভ্যতা, বাজার তদারকি এবং মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে। চালক ও পেছনের আরোহী—দুজনের জন্যই হেলমেট ব্যবহার এবং সঠিকভাবে ফাস্টেন করা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতা দরকার
বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন ও গতিসীমা-সংক্রান্ত নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকা এবং আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা এক বিষয় নয়।
অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বা হেলমেট না পরার মতো ঘটনা এখনো নিয়মিত দেখা যায়। কোথাও অভিযান শুরু হলে কিছুদিন নিয়ম মানার প্রবণতা দেখা যায়, কিন্তু অভিযান শেষ হলে অনেক ক্ষেত্রে আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে। এভাবে দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
আইন প্রয়োগ হতে হবে নিয়মিত, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক। একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর enforcement বাড়াতে হবে। স্পিড ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ও ডিজিটাল জরিমানার মতো ব্যবস্থা ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে।
শুধু চালককে দায়ী করলে হবে না
সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক সময় প্রথমেই চালককে দায়ী করা হয়। চালকের ভুল বা বেপরোয়া আচরণ অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কিন্তু সব দুর্ঘটনার দায় শুধু চালকের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
একজন চালক ভুল করতে পারেন। কিন্তু একটি নিরাপদ সড়কব্যবস্থার দায়িত্ব হলো সেই ভুল যেন মৃত্যুর কারণ না হয়। এজন্য সড়কের নকশা, গতিসীমা, যানবাহনের নিরাপত্তা, পথচারীর চলাচল এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি চিকিৎসা—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
WHO-এর Safe System Approach-এর মূল ধারণাও হলো, মানুষের ভুলকে মাথায় রেখেই এমন সড়কব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে একটি ভুলের পরিণতি যেন মৃত্যু বা গুরুতর আঘাত না হয়।
সমন্বিত আইন এখন সময়ের দাবি
সড়ক নিরাপত্তা কোনো একটি সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের একার দায়িত্ব নয়। সড়ক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ, চালকের দক্ষতা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ এবং দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা—সবগুলো বিষয় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
তাই প্রয়োজন এমন একটি সমন্বিত ও কার্যকর সড়ক নিরাপত্তা আইন, যেখানে নিরাপদ গতি, নিরাপদ সড়ক ও অবকাঠামো, নিরাপদ যানবাহন, মানসম্মত হেলমেট, চালকের প্রশিক্ষণ, আইন প্রয়োগ, দুর্ঘটনার তথ্য এবং জরুরি চিকিৎসা—সবকিছুর সুস্পষ্ট কাঠামো থাকবে।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে নির্ভরযোগ্য তথ্যও অত্যন্ত জরুরি। কোন সড়কে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে, কোথায় পথচারীর ঝুঁকি বেশি, কোন ধরনের যানবাহন বেশি দুর্ঘটনায় পড়ছে—এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। কেন্দ্রীয় দুর্ঘটনা তথ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থান চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
দুর্ঘটনা ঘটার পর কয়েক দিনের জন্য তৎপর হয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলে সমস্যার সমাধান হবে না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। দুর্ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা করাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়। একজন মানুষ বাড়ি থেকে বের হয়ে নিরাপদে কর্মস্থলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা অন্য কোনো গন্তব্যে যাবেন এবং সুস্থভাবে পরিবারের কাছে ফিরবেন—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত হেলমেট নিশ্চিত করা, আইন প্রয়োগ শক্তিশালী করা এবং নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি একটি কার্যকর সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রয়োজন।
সড়কে মানুষের জীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সময় এখনই।

 


এ জাতীয় আরো খবর