রবিবার, আগস্ট ৯, ২০২৬

‘মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ,গণতন্ত্র ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম’-ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • ২০২৬-০৮-০৮ ০৯:৫৩:৩৬
ছবি: সংগৃহীত।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের একক যুদ্ধ ছিল না; এটি ছিল জনগণের যুদ্ধ, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ভোটাধিকার, মানবিক মর্যাদা ও সমঅধিকার আদায়ের সংগ্রাম-এমন মন্তব্য করেছেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
তিনি বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাসের বহু ঘটনা, আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা এখনো যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি। নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে এসব ঘটনা সংরক্ষণ ও প্রকাশের উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে।
শুক্রবার ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবে বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস ফাউন্ডেশন আয়োজিত বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার কোর্সেস-এর ৫৪তম কমিশনিং ও ফেলোশিপ ডে উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীনতার পর এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে যে কয়েকটি ভাষণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অসংখ্য তরুণ, সাধারণ পরিবারের সন্তান, সৈনিক ও বেসামরিক মানুষ জীবন উৎসর্গ করে দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন। তাঁদের আত্মত্যাগের ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে ধরা জরুরি।
তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ দেশের মানুষ ছয় দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে স্পষ্ট রায় দিয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই গণরায় মেনে নেয়নি। পরবর্তী সময়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা ও নির্যাতন শুরু হলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের বাঙালি সদস্যরা বিদ্রোহ করে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭১ সালের মার্চে বাঙালি সৈনিক ও কর্মকর্তারা যদি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে না তুলতেন, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হয়তো ভিন্নভাবে লেখা হতো। দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে প্রতিরোধ গড়ে ওঠার পর হাজার হাজার ছাত্র ও তরুণ যুদ্ধে যোগ দেন।
তিনি জানান, প্রায় পাঁচ হাজার সৈনিকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে প্রায় ৮০ হাজার তরুণ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা প্রায় এক লাখে পৌঁছায়। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআরের সদস্যরা এসব তরুণকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেন। এই গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস সংরক্ষণের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের জন্য যুদ্ধ করার সুযোগ না পেলে অনেক তরুণ কান্নায় ভেঙে পড়তেন। এমনকি কেউ কেউ যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি পাওয়ার জন্য গাড়ির সামনে পর্যন্ত শুয়ে পড়তেন। দেশের প্রতি তাঁদের এমন ভালোবাসা ও আত্মত্যাগ মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের অনন্য অধ্যায়।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিশেষ করে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা জাতিকে উদ্দীপ্ত করেছিল। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষেও ঘোষণা দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধারা ব্যক্তিগত কৃতিত্বের জন্য অস্ত্র হাতে নেননি। দেশের অস্তিত্ব, মানুষের জীবন এবং মা-বোনের সম্মান রক্ষার জন্যই তাঁরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির যুদ্ধ করার সক্ষমতাকে অবজ্ঞা করলেও বাঙালি সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধারা সাহস, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে সেই ধারণা ভুল প্রমাণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সীমান্তবর্তী বিভিন্ন যুবশিবিরে হাজার হাজার স্কুল-কলেজপড়ুয়া তরুণ যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। সীমিত খাবার, কঠোর জীবনযাপন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎও তাঁদের মনোবল ভাঙতে পারেনি।
বিদেশে সামরিক প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কামালপুরসহ বিভিন্ন যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতার কথা শুনে বিদেশি সামরিক প্রশিক্ষকেরাও বিস্মিত হতেন। তাঁদের মতে, দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত মানুষ ছাড়া এমন অসাধারণ সাহসিকতা দেখানো সম্ভব নয়।
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও মুক্তিযোদ্ধাদের অনেক স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশের মানুষ যে গণঅভ্যুত্থান করেছে, সেটিও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। এ বাস্তবতায় রাজনীতিকদের আত্মসমালোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, দেশে আর কোনো স্বৈরশাসনের সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। সরকার ভুল করলে জনগণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তা সংশোধন করবে। কিন্তু কোনো পরিস্থিতিতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা যাবে না।
বক্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিও শ্রদ্ধা জানান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল। এ সময় তিনি তাঁর প্রয়াত স্ত্রী দিলারা হাফিজের কথাও স্মরণ করেন।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গড়ে ওঠার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে দেশের সেনাবাহিনী ছিল ছোট। তবে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গের অদম্য মানসিকতাই ছিল সেই বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন মেজর এ মতিন চৌধুরী। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন এবং নৌবাহিনী প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম বক্তব্য দেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
সন্ধ্যা ৮টার দিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মাননা স্মারক দেওয়া হয়। পরে সংগঠনের মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিরান হামিদুর রহমান উপস্থিত অতিথিদের ধন্যবাদ জানান।

মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র, সমঅধিকার


এ জাতীয় আরো খবর