রবিবার, আগস্ট ৯, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রীর মাতারবাড়ি সফর ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা,মাঠে বিভাগীয় কমিশনার-ডিআইজি

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৮-০৮ ২৩:৫১:৫৯

মহেশখালী (কক্সবাজার). 
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব  গ্রহণের  পর  প্রথমবারের মতো কক্সবাজারের দ্বীপ  উপজেলা  মহেশখালীর  মাতারবাড়িতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী  তারেক  রহমান।  আগামীকাল রোববার (৯ আগস্ট) তাঁর  এক  দিনের  চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সফরের  অংশ  হিসেবে  মাতারবাড়ির   মেগা  উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শনের কথা রয়েছে। 
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে  কেন্দ্র করে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর,কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় নেওয়া হয়েছে  ব্যাপক নিরাপত্তা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি।  প্রধানমন্ত্রীর  সফরকে  সামনে  রেখে শনিবার সকাল  থেকেই  মাতারবাড়িতে ছিল বাড়তি তৎপরতা। নির্ধারিত  ভেন্যু, আশপাশের  এলাকা  এবং  নিরাপত্তা ব্যবস্থার  সার্বিক  প্রস্তুতি  সরেজমিনে পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম   বিভাগীয়  কমিশনার  ড.মো. জিয়াউদ্দীন ও চট্টগ্রাম  রেঞ্জের  ডিআইজি   আবদুল  কুদ্দুছ  চৌধুরী, পিপিএম।  তাঁরা  ভেন্যু  প্রস্তুতি,  নিরাপত্তা  পরিকল্পনা, আইনশৃঙ্খলা  পরিস্থিতি  এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বিত কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন।নিরাপত্তার বলয়ে মাতারবাড়ি,   প্রধানমন্ত্রীর     সফরকে    কেন্দ্র    করে মাতারবাড়ির   গুরুত্বপূর্ণ    স্থাপনাগুলোতে   নিরাপত্তা জোরদার   করা    হয়েছে।   আইনশৃঙ্খলা   রক্ষাকারী বাহিনী, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের   মধ্যে   সমন্বয়  বাড়ানো  হয়েছে। নির্ধারিত ভেন্যুর প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের   সঙ্গে   মতবিনিময়    করেন     বিভাগীয় কমিশনার  ও   ডিআইজি।    সফর নির্বিঘ্ন, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ     করতে      দায়িত্বপ্রাপ্তদের       প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও  দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর  মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পর্যায়ের একজন ব্যক্তির সফর হওয়ায় নিরাপত্তার   পাশাপাশি  ভেন্যু  ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, প্রবেশ    ও    চলাচল    ব্যবস্থাপনাসহ  সংশ্লিষ্ট  বিষয় গুলোতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কেন গুরুত্বপূর্ণ মাতারবাড়ি? 
মাতারবাড়ি শুধু মহেশখালীর একটি এলাকা নয়;এটি বাংলাদেশের    ভবিষ্যৎ    বন্দর, জ্বালানি    ও  শিল্প অর্থনীতির   অন্যতম   গুরুত্বপূর্ণ  কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। মাতারবাড়ি  গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে পরিকল্পিত। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত  ব্যয়    প্রায়  ১৭  হাজার ৭৭৭  কোটি টাকা। বন্দরের   জন্য    দীর্ঘ   ও   গভীর  অ্যাপ্রোচ   চ্যানেল নির্মাণসহ  ব্রেকওয়াটার  এবং   টার্মিনাল অবকাঠামো গড়ে  তোলা   হচ্ছে।  ২০২৬    সালের  মে  মাসে  দীর্ঘ প্রতীক্ষার  পর  মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণের মূল কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার  খবরও  প্রকাশিত  হয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এবারের    সফর    এমন   এক   সময়ে   হচ্ছে, যখন মাতারবাড়ি  বন্দরের  মূল  অবকাঠামো  নির্মাণ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। গভীর সমুদ্রবন্দর বদলে দিতে পারে বাণিজ্যের চিত্র,মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে  বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের   পরিবর্তনের  প্রত্যাশা  রয়েছে। গভীর  পানির কারণে   বড়   আকারের    জাহাজ   সরাসরি  বন্দরে ভেড়ানোর  সুযোগ  তৈরি হলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় কমার  সম্ভাবনা  রয়েছে।  প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট পূর্ববর্তী তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের   টার্মিনালে   বড়  কনটেইনার জাহাজ   পরিচালনার  সক্ষমতা   তৈরির   পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে বন্দরের যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও প্রকল্পের অংশ।  এ কারণে  মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরকে   শুধু   একটি  বন্দর প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং  দেশের  শিল্পায়ন, আমদানি-রপ্তানি ও লজিস্টিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক    তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রও     এই    অঞ্চলের আরেকটি   গুরুত্বপূর্ণ     স্থাপনা।     বিদ্যুৎ  উৎপাদন অবকাঠামোর   পাশাপাশি  কেন্দ্রটির সঙ্গে সমুদ্রপথে জ্বালানি  পরিবহন   ও   বন্দর  অবকাঠামোর একটি আন্তঃসম্পর্ক   রয়েছে। মাতারবাড়িকে   ঘিরে  বিদ্যুৎ, বন্দর, যোগাযোগ  ও   শিল্প   অবকাঠামোর  সমন্বিত বিকাশের ফলে পুরো মহেশখালী অঞ্চলকে ভবিষ্যতের একটি  গুরুত্বপূর্ণ   অর্থনৈতিক  অঞ্চল হিসেবে দেখার সুযোগ    তৈরি    হয়েছে।    প্রশাসনের   নজর   এখন মাঠপর্যায়ে,প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে কক্সবাজার জেলা  প্রশাসন, মহেশখালী  উপজেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা  রক্ষাকারী  বাহিনী  এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত প্রস্তুতি চলছে।
শনিবারের   মাঠপর্যায়ের   পরিদর্শনে  সংশ্লিষ্ট   বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিল। নিরাপত্তা   পরিকল্পনার  পাশাপাশি  ভেন্যু প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন   সংস্থার   দায়িত্ব  ও  সমন্বয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রশাসনের   মূল   লক্ষ্য   প্রধানমন্ত্রীর  কর্মসূচি নির্ধারিত  সময়সূচি  অনুযায়ী  সম্পন্ন করা এবং একই সঙ্গে  স্থানীয়  পর্যায়ে  যাতে  অপ্রয়োজনীয় জনদুর্ভোগ তৈরি না হয়,  তা  নিশ্চিত করা। স্থানীয়দের  প্রত্যাশাও কম নয়,প্রধানমন্ত্রীর মাতারবাড়ি সফরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের  মধ্যেও  তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। বছরের পর  বছর  ধরে  মাতারবাড়িকে  ঘিরে  বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প   বাস্তবায়ন   হলেও    স্থানীয়   জনগোষ্ঠী এসব প্রকল্পের সুফল কতটা পাচ্ছে এ প্রশ্নও রয়েছে।
স্থানীয়দের    প্রত্যাশা, বন্দর  ও  বিদ্যুৎকেন্দ্রকেন্দ্রিক উন্নয়ন    কর্মকাণ্ডের    পাশাপাশি   স্থানীয়  মানুষের কর্মসংস্থান,   যোগাযোগব্যবস্থা,   শিক্ষা,   স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ   সুরক্ষা   এবং  জীবনমান  উন্নয়নে আরও কার্যকর  পদক্ষেপ  নেওয়া  হবে।  বিশেষ করে মেগা প্রকল্পের কারণে স্থানীয়ভাবে যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড তৈরি  হচ্ছে,  তার   একটি  বড়   অংশ  যেন   স্থানীয় জনগণের  জীবন-জীবিকায়  ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এমন প্রত্যাশা  রয়েছে  তাদের। উন্নয়ন  ও নিরাপত্তার পাশাপাশি পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ,  মাতারবাড়ির  মতো উপকূলীয় এলাকায় বড় অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশ  ও   স্থানীয়  জীববৈচিত্র্য   রক্ষার  বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।  সমুদ্র,  খাল,  কৃষিজমি, মৎস্যসম্পদ এবং স্থানীয় জনজীবনের  ওপর  বড়  প্রকল্পগুলোর প্রভাব নিয়মিত    পর্যবেক্ষণের    প্রয়োজন    রয়েছে।  ফলে প্রধানমন্ত্রীর   সফরকে   ঘিরে   নিরাপত্তা   ও   প্রকল্প পরিদর্শনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয়   জনগোষ্ঠী  ও  পরিবেশের বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব  পাবে  এমন  প্রত্যাশাও  রয়েছে  সংশ্লিষ্ট মহলে।
জাতীয়  অর্থনীতির   নতুন   দ্বার?  মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে দেশের সমুদ্রবন্দর ব্যবস্থায় নতুন সক্ষমতা  যুক্ত  হওয়ার  সম্ভাবনা  রয়েছে। বড় জাহাজ সরাসরি পণ্য  ওঠানামার  সুযোগ পেলে ট্রান্সশিপমেন্ট নির্ভরতা    কমানো,   পরিবহন    ব্যয়    কমানো  এবং আমদানি-রপ্তানিতে সময় সাশ্রয়ের সম্ভাবনা তৈরি হবে। পূর্ববর্তী সরকারি তথ্যেও মাতারবাড়ি বন্দরকে জাতীয় অর্থনীতির  জন্য  গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।  অন্যদিকে   বিদ্যুৎকেন্দ্র, বন্দর, সড়ক ও সম্ভাব্য শিল্পাঞ্চলকে কেন্দ্রকরে মহেশখালী-কক্সবাজার অঞ্চলে   নতুন   অর্থনৈতিক  কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর  সফরে  নতুন  বার্তার অপেক্ষা, সব মিলিয়ে  প্রধানমন্ত্রীর  মাতারবাড়ি সফরকে ঘিরে এখন নজর    দেশের    অন্যতম   বৃহৎ  উন্নয়ন  অবকাঠামো প্রকল্পের  এই  অঞ্চলের  দিকে।  একদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফর   নির্বিঘ্ন   করতে   প্রশাসনের    সর্বোচ্চ   প্রস্তুতি, অন্যদিকে   দেশের   প্রথম  গভীর   সমুদ্রবন্দরের  মূল অবকাঠামো   নির্মাণের  নতুন  পর্যায় দুই দিক থেকেই এবারের   মাতারবাড়ি   সফরকে   তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।  প্রধানমন্ত্রীর   সফরে   মাতারবাড়ির মেগা প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ,উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা নিয়ে কী ধরনের বার্তা আসে,সেটিই এখন দেখার বিষয়।


এ জাতীয় আরো খবর