অনেক দিন পর আজ বিকেলে পরিপাটি করে সেজেছিলাম। শাড়ি কাজল টিপ লিপস্টিক --- আমার প্রিয় যা কিছু, সাজে সবই ছিলো।
পরিপাটি করে সাজুগুজু করার শখ আমার অনেক পুরনো। শৈশবের শেষ, বাল্যকাল শুরু থেকে আমি পরিপাটি সাজ পছন্দ করি।
মুক্তিযুদ্ধের আগের বছর মায়ের সাথে এক মাসের জন্য কলিকাতা বেড়াতে গেছিলাম। অনেক বেড়িয়েছি, যাদুঘর চিড়িয়াখানা গড়ের মাঠ---সুন্দর সুন্দর জামা পরে মা কাকিমার সাথে বেড়াতে গেছি। মা কাকিমাও সুন্দর শাড়ি পরতো, সুন্দর করে সাজতো।
এরপর মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় সাত মাস কলিকাতায় শরণার্থী হিসেবে ছিলাম। তখন আমরা কেউই সাজুগুজু করতাম না, কোথাও বেড়াতেও যেতাম না।
কিন্তু আশেপাশে সবাইকে দেখতাম বিকেল হতেই সুন্দর সাজগোজ করে বাইরে বেরিয়েছে, অথবা প্রতিবেশীদের সাথে গল্প গুজব করছে। আমার শিশুমনে বিকেল হলেই কলকাতার মেয়েদের এই যে পরিপাটি করে সাজুগুজু করার রীতি, খুব ইতিবাচক রেখাপাত করেছিলো নিশ্চয়ই।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে ফিরে এসেছি। সাথে করে নিয়ে এসেছি কলিকাতার মেয়েদের বৈকালিক সাজগোজের রীতি। তখন থেকেই আমিও বিকেল হলেই চোখে কাজল দিতাম, মুখে পাউডার দিতাম, চুল সুন্দর করে আঁচড়াতাম, পরিষ্কার জামা পরে বারান্দায় একটা কাঠের টুলের উপর চুপচাপ বসে থাকতাম। আমার তো কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ছিলো না, খেলার সাথীও ছিলো না। তবুও আমি সাজুগুজু করে বারান্দাতেই বসে থাকতাম।
এরপরেও কত বার কলিকাতা বেড়াতে গেছি। বাবা মায়ের সাথে গেছি, আমার উত্তমের সাথে গেছি, আমি একাও গেছি।
প্রতিবারই কলকাতার যা সবচেয়ে বেশী ভালো লাগে, তা হলো কলকাতার মেয়েরা।
কলকাতার মেয়েরা কিন্তু ভীষণ কর্মঠ। সারাদিন ওরা ঘরে বাইরে কাজ করে, পুরুষের সাথে পাল্লা দিয়ে বাস ট্রেন ট্রামে চড়ে কাজে যায়।
এত কাজের মাঝেও তাদের সকলেই সাজ পোশাকে পরিপাটি থাকে।
আজও বিকেল হতেই ওরা হাত মুখ ধুয়ে পরিপাটি করে চুল বেঁধে, সাধারণ শাড়িটিকেই অসাধারণ সুন্দর করে পরে বাইরে বের হয়। বন্ধুদের সাথে হাসি মুখে গল্প করে, প্রেমিকের সাথে হাসিমুখে বাদাম চিবোয়, ফুচকা খায়, মাঠে বেড়ায়।
ঘরের বৌরা সুন্দর করে সেজে গুজে প্রতিবেশীদের সাথে একটু আড্ডা গল্প করে, কেউবা সিনেমা দেখতে যায়, কেউ বা দোকানে যায় রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে।
যে যে কাজই করুক, সাজ পোশাকে সকলেই পরিপাটি থাকে।
আমি এতো দিনে সাজুগুজুর সার সত্যটা উপলব্ধি করেছি।
সাজ পোশাকে পরিপাটি থাকলে মনটা ভালো থাকে। মন ভালো থাকলে কাজ কর্মে গতি বাড়ে, কাজ কর্মে সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায়।
সবচে বড় কথা, মন ভালো থাকলে বেঁচে থাকাটুকু উপভোগ্য হয়ে ওঠে।