ঘুমিয়ে পড়েছিল মোহনা। হঠাৎ মোবাইল ফোনের শব্দ শুনে জেগে ওঠে। অবশ্য ঘরে জাগানোর মতো কেউ থাকে না এসময়। মা ছেলে দুজনের সংসার। ছেলে মাহির নাস্তা করে চলে গেছে স্কুলে। মাহিরের বাবা এখানে থাকে না। ফোনটা অবশ্য মাহিরের বাবা করেনি। মোহনা কল রিসিভ করতেই দরজায় খটাখট শব্দ। ফোন না কেটেই বিরক্তি চোখে মোহনা দরজা খুলে দেখল একজন মহিলা কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এরা গতকাল উঠেছিল মোহনার পাশের ফ্ল্যাটে। সালাম বিনিময় করেই হাতের ইশারায় ডাল ঘোটনাটি দিতে বললেন তিনি। মোহনা দ্রুত কিচেন থেকে সেটি এনে তার হাতে দিতেই সে দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল। মোহনা দরজা বন্ধ করে তার সেই ফোনালাপে মন দিল। ওদিকে ঘোটনা নিয়ে এসে রাবেয়া কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল।
এখনো সব জিনিসপত্র গোছানো হয়নি। হঠাৎ করেই বাসা নিতে গিয়ে সব একেবারে এলোমেলো। তখনি খেয়াল হলো, বাজার থেকে এসে সে গায়ের বোরখাটাও খোলেনি। এ অবস্থায় পাশের বাসায় গিয়েছিল। অবশ্য তাদের যে পরিস্থিতি তাতে এসব মনে রাখার অবস্থায় সে নেই। রাবেয়ার বড়ো ছেলেটা ভীষণ অসুস্থ। দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা দরকার, সেজন্যই গ্রাম থেকে দ্রুত বাসা ভাড়া নিয়ে শহরে চলে এলো রাবেয়ার পরিবার।
সকালে স্বামীর অফিস, মেয়ের নতুন স্কুল সবকিছুর সাথে তাল মেলাতে গিয়ে অনেকটা খেই হারিয়ে ফেলেছে সে। পাশের বাসার আপাটি তাকে কি ভাবল সেটি মনে আসতেই লজ্জা পেল রাবেয়া। একা থাকায় ফোনে অধিক সময় দিলেও মোহনা বেশ মিশুক মেয়ে। কয়েকদিনের মধ্যেই রাবেয়ার সাথে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে ফেলেছে। রাবেয়ার ছেলের অসুস্থতার খোঁজ নিতে মোহনা প্রতিদিন আসে। দুজনের খুব ভালো সময় কাটে। কিন্তু মাসের পর মাস পার হয়ে যায় মোহনার স্বামীকে দেখেনি রাবেয়া।
একদিন বিকেলে ছাদে গিয়ে কথায় কথায় মোহনার স্বামীর সম্পর্কে জানতে চায় রাবেয়া। মোহনা হেসে বলে সে ভোলা চাকরি করে। অনেকদূর তো তাই দেরিতে আসে। রাবেয়া পাল্টা প্রশ্ন করে ঈদের সময়ও আসেনি ?
মোহনা ঠান্ডা স্বরে বলে, আসেনি। অনেক ঝামেলা আছে। অন্য একদিন বলব।
চোখের পানি লুকাতে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে চলে যায় সে। পরবর্তী কিছুদিন রাবেয়া আর সে প্রসঙ্গ তোলে না। কিন্তু একদিন দুপুরে জোরে জোরে কান্নার শব্দ পায় মোহনার ঘর থেকে। রাবেয়া উঁকি দিতেই মোহনা এসে রাবেয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। শান্ত হবার পর তার কথায় জানতে পারে কয়েকমাস আগেই ভোলায় কাজের মহিলাকে বিয়ে করে ফেলেছিল লোকটা। এখন ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে। রাবেয়া ভাবে এত বছরের সংসার, রংধনু মুহূর্ত, তৃপ্তির রসনা, দুঃখ ভাগাভাগি সবই কালির আঁচড়ে মিথ্যে হয়ে গেল। আনমনা হয়ে মোহনা বলল, বিশ্বাসের পাল ছিঁড়েছিল অনেক আগেই। নারীর শরীরই তার কাছে প্রাধান্য পেয়েছিল। তাই বলে তোমাদের একমাত্র সন্তানের কথা সে একবারও ভাবল না! রাবেয়ার কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরে পড়ে। বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে মোহনাকে। রাবেয়ার সংসর্গে মানসিক দুরবস্থা থেকে ধীরে ধীরে মনোবল ফিরে আসে তার।
পারিবারিক সাপোর্ট সে তেমন পায় না কারণ মোহনার বাবা জীবিত নেই। মা অসুস্থ। ভাইয়েরা নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আরেকটি কারণ হলো বাবা বেঁচে থাকতেই সম্পত্তির ভাগ দিয়ে গেছেন মোহনাকে। সেটা তখন অত গুরুত্ব না দিলেও এখন ছেলেকে নিয়ে সংসার চালাতে মোহনার বেশ কাজে লাগছে। বিয়োগ ব্যথা কাটিয়ে আবারও মোবাইল হাতে নেট দুনিয়ায় ব্যস্ত হয় মোহনা। পরের মাসে একদিন মোহনার দূর সম্পর্কের এক মামা পুনরায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে তার বাসায়। মোহনা শুনেই তা বাতিল করে দেয়। তার এক কথা, আমরা মা ছেলে এভাবেই ভালো আছি । কিন্তু বাবা ছাড়া ছেলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। মামার এই যুক্তিতে মোহনা ভাবনায় পড়ে। সেই সুযোগে মামা জানালেন এই লোকটির বউ,বাচ্চা নেই। সে প্রবাসে থাকার সুযোগে বউ পালিয়ে গিয়েছিল। অভিমানে এতবছর সে দেশেই আসেনি। এখন অসুস্থ মায়ের অনুরোধে বিয়ে করতে চাইছে।
মোহনা একটু ভাবার সময় নিল। মামা চলে যাবার সময় অনলাইনে যোগাযোগ করার ঠিকানা দিয়ে গেল। অবশেষে রাবেয়ার সাথে পরামর্শ করে অনলাইনে লোকটার সাথে যোগাযোগ করল মোহনা। লোকটার মার্জিত অভিব্যক্তি মোহনার বেশ ভালো লাগল। ধীরে ধীরে অনলাইনে দুজনের নিয়মিত কথা শুরু হলো। একাকী জীবনে উষ্ণতার পরশ ছড়ালো প্রতিদিনের আলাপচারিতায়।