২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অম্লান অধ্যায়। অন্তর্বর্তী সরকার “জুলাই ঘোষণাপত্র”কে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে — ৫আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস উন্মোচন করলেন “জুলাই ঘোষণাপত্র”, ২৮ পয়েন্টের এক সমঝোতামূলক রাজনীতির দৃষ্টিপত্র। কিন্তু এই ‘মার্কি’ ঘোষণা কীভাবে শাসনব্যবস্থা গড়বে— তা নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সমালোচনা৷
৫৪ বছরের স্বাধীন বাংলাদেশে শুধু একটি দল কি এককভাবে দেশ চালিয়েছে? বাস্তবে না। সামরিক শাসক, তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার, জোট রাজনীতি—সবকিছুর ছাপ রয়েছে দেশের রাজনীতিতে। অথচ জুলাই ঘোষণাপত্রে সেই বহুমাত্রিক ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করে শুধু একদলীয় ব্যর্থতা ও স্বৈরতন্ত্রকেই প্রধান শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে।
এই একমুখী দৃষ্টিভঙ্গি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিকৃত করে। যে ঘোষণাপত্র ভবিষ্যৎ রাজনীতির রূপরেখা দেবে বলে দাবি করছে, সেটি ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ—ফলে এর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।
যে সব সরকার জনগণকে বিভ্রান্ত করেছে, দুর্নীতি করেছে, বিচারবহির্ভূত হত্যা করেছে—তাদের নাম উল্লেখ নেই। কেবল একটি বিশেষ সময় ও দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আক্রোশের ভাষা ব্যবহার করে ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়েছে। এভাবে ইতিহাসের দায়ভার একপক্ষের ঘাড়ে চাপানো যেমন অনৈতিক, তেমনি ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্যও অশুভ বার্তা।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ছাত্র ও সাধারণ মানুষ। অথচ ঘোষণাপত্রে সেই ত্যাগ-অবদান স্বীকৃতি পায়নি। আন্দোলনের সমন্বয়ক, কো-অর্ডিনেটর ও মাঠের নেতারা বঞ্চিত। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এ ঘোষণাপত্র কার জন্য? ছাত্র ও জনতার জন্য, নাকি কেবল ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রে অবস্থান নেওয়া কিছু সুবিধাভোগীর জন্য?
ঘোষণাপত্র তৈরিতে বামপন্থী দল ও নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—এই নথি একদলীয় স্বার্থের রূপরেখা, জাতীয় সমঝোতা নয়। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে বাদ দিয়ে যেকোনো জাতীয় ঘোষণাই একসময় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে, এবং জুলাই ঘোষণার ক্ষেত্রেও একই পরিণতি আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঘোষণাপত্রে বড় বড় প্রতিশ্রুতি থাকলেও তার কোনো সাংবিধানিক বা আইনি কাঠামো নেই। সংসদীয় অনুমোদন বা জনভোট ছাড়া এই ঘোষণাপত্র কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই এটিকে অনেকেই কেবল একটি প্রতীকী দলিল হিসেবে দেখছেন—যা হয়তো আগামী দিনের রাজনৈতিক বিতর্কে ব্যবহার হবে, কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন আনবে না।
জুলাই ঘোষণাপত্রকে বলা হচ্ছে “নতুন পথের নকশা”। কিন্তু যেখানে ইতিহাস বিকৃত, ছাত্র-জনতার অবদান উপেক্ষিত, বিরোধী শক্তি বাদ, এবং আইনি ভিত্তি অনুপস্থিত—সেখানে এই নথি প্রকৃত অর্থে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হতে পারে না। বরং এটি একদলীয় আখ্যানকে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবেই জনগণ দেখছে।
একটি সত্যিকারের জাতীয় ঘোষণার জন্য প্রয়োজন—
সকল রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ,
পূর্ণাঙ্গ ও সৎ ইতিহাসের স্বীকৃতি,
আইনি ভিত্তি ও বাস্তবায়নের স্পষ্ট রূপরেখা।
বক্তব্য এবং উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সদর্থক হলেও “জুলাই ঘোষণাপত্র” ত্রুটি পূর্ণ এক একতরফা রাজনীতির লক্ষণ তুলে ধরেছে। এটি একটি স্মৃতির গ্রন্থ হলে— তা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। জনসম্মতি ও আইনি কার্যকরতা ছাড়া, এই ঘোষণাপত্র শাসনের নকশার প্রথম ধাপের আদর্শ হতে পারে, কিন্তু কেবল কাগজেই বন্ধে রয়ে যাবে।
এসব ছাড়া জুলাই ঘোষণাপত্র কেবল নতুন মোড়কে পুরনো রাজনীতির প্রতারণা হয়ে থাকবে।
মূল ত্রুটি ও বিরূপ দিকসমূহ
১. একতরফা ইতিহাস-আধুনিক ন্যারেটিভ
বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তীব্র সমালোচনায় উল্লেখ করেছেন–– ঘোষণাপত্রটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির নথিপত্র, যা স্বৈরাচারী হাসিনাজমিনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কারণ ব্যাখ্যা করার চক্রান্তে যেতে পারে
। ১৯৭২-এর সংবিধানের ‘দ্রাফ্টিং ও স্ট্রাকচার দুর্বলতার’ মতো হঠকারিতার উদ্ভোগ দিয়ে পুরো এক রাজনীতির আভিজাত্যকেন্দ্রকরণ প্রশ্নবিদ্ধ
২. সময়ের ইতিহাস বাদ: শুধুমাত্র একদলের বর্বরতা নয়?
প্রতিটি সময়েই স্বৈরাচারী শাসন ও রাষ্ট্রীয় অপরাধ ঘটেছে— এর ইতিহাস গুটিয়ে রাখা হয়েছে এই ঘোষণাপত্রে। বর্ষপঞ্জি–1947, পিলখানা, শাপলা স্কয়ার নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ইত্যাদি উল্লেখ ছাড়াই একটি সংকীর্ণ রাজনীতির স্মৃতি ফর্মেশন ঘটেছে
৩. বিরোধী দল ও ছাত্রমঞ্চের বহিষ্কার
বামপন্থী দলগুলো (Left Democratic Alliance, রেভোলিউশনরি ওয়ার্কার্স পার্টি ইত্যাদি) জানিয়েছে, ঘোষণাপত্র তৈরিতে তাদের কোনো অংশগ্রহণ ছিল না, ফলে তারা শপথতালিকার বাইরে থেকেছেন।
একইভাবে, NCP (National Citizen Party) বলছে, এই নথি ‘BNP-ভিত্তিক’ এবং অন্য রাজনৈতিক ও শিক্ষার্থী নেতা–সংগঠনদের চাহিদা ও বঞ্চিত করেছে । গ্রুপের প্রাক্তন শীর্ষ আস্তেপাস্তা লোকেদের উদাসীনতা এটা স্পষ্ট করে দেয়।
৪. ছাত্র-জনতার বঞ্চনা এবং বর্জন
ঘোষণাপত্রেই ছাত্র-জনতার নেতা ও সংগঠকদের, যাঁরা আন্দোলনের প্রাণ— তাঁদের ‘অমৃত’ রূপে জনগণের বুক থেকে আত্নপরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টাও চলছে। Abdul Hannan Masud উল্লেখ করেন, ১৫৮ জন কো-অর্ডিনেটর এবং আন্দোলনের ছাত্রনেতা–দের যেভাবে অবজ্ঞা করা হয়েছে— তা একধরনের সাম্প্রতিক বঞ্চনার নিদর্শন
৫. আইনগত গুরুত্বহীন — পার্লামেন্টারি অধিকারিকতা নেই
রয়টার্স ও AP নার্ভ করে জানাচ্ছে, ঘোষণাপত্রটি সাংবিধানিক ‘পরামর্শ’ হিসেবেই লেখা হয়েছে— অথচ প্রয়োগের কোনো আইনগত কাঠামো নেই। বস্তুত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়— “এই ঘোষণাটি পার্লামেন্টে রূপান্তর না পেলে শুধুই প্রতীকী হয়ে থাকবে”