বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পদ্ধতিতে পরিবর্তনের বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে ৩০টি রাজনৈতিক দল। বৃহস্পতিবার (১০ জুলাই) রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির দোয়েল হলে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আয়োজনে দ্বিতীয় পর্যায়ের ১১তম দিনের সংলাপে এই ঐকমত্য গড়ে ওঠে।
আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন কমিশনের সহ-সভাপতি ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি সাংবাদিকদের জানান, "সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পদ্ধতি সংস্কার এবং রাষ্ট্রপতির জন্য আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বাধ্যবাধকতা আরোপ করার বিষয়ে আজকের সংলাপে অংশ নেওয়া দলগুলো সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন।"
বর্তমানে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেন এবং এতে বিচারপতিদের সিনিয়রিটির বাধ্যবাধকতা নেই। তবে, সংলাপে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে, এই পদ্ধতি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং গ্রহণযোগ্যতা রক্ষায় যথেষ্ট নয়।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো হলো:
সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে সংশোধন এনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত করা।
শুধুমাত্র আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকে সিনিয়রিটির ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা ছাড়া গণতন্ত্র টেকসই হয় না। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তন প্রয়োজন।”
সংলাপে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা বলেন, অতীতে বিচারপতি নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা হ্রাস করেছে। তাই একটি নিরপেক্ষ, জবাবদিহিমূলক এবং পদ্ধতিগত কাঠামো তৈরি এখন সময়ের দাবি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংলাপগুলোতে ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সংলাপের এ পর্যায়ে বিচার বিভাগের কাঠামো ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপারিশপত্র তৈরি হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার ও জাতীয় সংসদে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হবে।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, শুধু প্রধান বিচারপতি নয়, ভবিষ্যতে বিচারপতি নিয়োগ বোর্ড,পার্লামেন্টারি ওভারসাইট কমিটি গঠনের বিষয়েও প্রস্তাব উঠতে পারে।
এক প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় ঐক্য পার্টির মহাসচিব সৈয়দ আশরাফ আলী বলেন, "আমরা চাই একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ যেখানে বিচার বিভাগ হবে রাষ্ট্রের প্রকৃত স্তম্ভ। প্রধান বিচারপতি নিয়োগে সিনিয়রিটির ভিত্তি বাধ্যতামূলক করাটা এই পথচলার প্রথম ধাপ।"
বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের নেতা বলেন, “সংবিধানের অস্পষ্টতা বা রাষ্ট্রপতির অবারিত ক্ষমতা, বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নষ্ট করে। আমরা এই সংস্কারকে স্বাগত জানাই।”
প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পদ্ধতিগত সংস্কারে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর এই ঐকমত্য জাতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই উদ্যোগ শুধু বিচার বিভাগের মর্যাদা পুনরুদ্ধারই নয়, গণতন্ত্রের গভীরতর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণেও সহায়ক হবে।