শনিবার, মে ২, ২০২৬

শীর্ষ ঝুঁকিতে দেশের ৩২ বিমা কোম্পানি: আইডিআরএর বিশ্লেষণে গভীর সংকেত

  • নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • ২০২৫-০৭-০২ ২২:৫৫:৩৩

বাংলাদেশের বিমা খাতে গভীর অনাস্থা ও কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে কার্যরত ৮১টি বিমা কোম্পানির মধ্যে ৩২টি প্রতিষ্ঠানকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি জীবন বিমা ও ১৭টি সাধারণ বিমা কোম্পানি রয়েছে।
বুধবার (২ জুলাই) রাজধানীর মতিঝিলে আইডিআরএর প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির চেয়ারম্যান ড. এম আসলাম আলম বলেন, “বিমা খাতের টেকসই উন্নয়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেসব কোম্পানি সময়মতো বিমা দাবির অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ, তারাই মূলত ঝুঁকির কেন্দ্রবিন্দুতে।”
যদিও সংবাদ সম্মেলনে ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির নাম সরাসরি প্রকাশ করা হয়নি, তবে আইডিআরএর একটি অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে:
জীবন বিমা খাতে - ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, প্রাইম ইসলামী লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, সানলাইফ, গোল্ডেন লাইফ, বায়রা লাইফ, প্রগ্রেসিভ লাইফ, এনআরবি ইসলামিক লাইফ, ডায়মন্ড লাইফ, বেস্ট লাইফ, প্রটেক্টিভ ইসলামী লাইফ, যমুনা লাইফ এবং স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
এদের বেশিরভাগই গত এক দশকে পলিসি হোল্ডারদের বিমা দাবি নিয়মিতভাবে অস্বীকার বা বিলম্বিত করার অভিযোগে জনআস্থার বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানান, বর্তমানে জীবন বিমা খাতে ৪৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিমা খাতে প্রায় ৪৭ শতাংশ দাবি এখনো পরিশোধ হয়নি। তিনি বলেন, “মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে, তারা বিমা করলেও সময়মতো ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না। এতে খাতটির প্রতি মানুষের আগ্রহ ও আস্থা কমছে। এ চিত্র পুরো শিল্পকে পিছিয়ে দিচ্ছে।”
ড. আসলাম আলম জানান, এই ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করার পর শুধু পর্যবেক্ষণ নয়, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও ভাবছে আইডিআরএ। এর মধ্যে রয়েছে কোম্পানি একীভূতকরণ, অবসায়ন, অধিগ্রহণ বা রেগুলেটরি টেকওভার। তিনি বলেন, “আমরা ব্যাংক খাতের মতো বিমা খাতেও পৃথক রেগুলেশন অধ্যাদেশ তৈরির সুপারিশ করেছি। এতে কোম্পানিগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।”
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ২০১০ সালে দেশে বিমা খাতের অবদান ছিল জিডিপির ০.৯৪ শতাংশ। কিন্তু ২০২৩ সালে তা নেমে এসেছে ০.৪১ শতাংশে, এবং ২০২৪ সালে আরও কমেছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে দুর্বল সেবাদান, অপ্রশিক্ষিত জনবল এবং খাতের প্রতি জনগণের আস্থার অবনতি।
২০২৪ সালেই বিমা গ্রাহকদের কাছ থেকে আইডিআরএ পেয়েছে ২৪,৮৫২টি অভিযোগ। তবে জনবল সংকটের কারণে এসবের কার্যকর তদারকি সম্ভব হচ্ছে না বলে জানায় সংস্থাটি। সংস্থার অনুমোদিত জনবল ১৬০ হলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১০২ জন।
নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়িয়ে প্রতি হাজার টাকায় ৫ টাকা করার প্রস্তাব করেছে আইডিআরএ, যা আগে ছিল ১ টাকা। এর ফলে কিছু দুর্বল কোম্পানি আর্থিক চাপে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হলেও চেয়ারম্যান বলেন, “আমাদের প্রশাসনিক ব্যয় বেড়েছে। জনবল বাড়াতে হলে স্বয়ংসম্পূর্ণতা জরুরি। তাই ফি বাড়ানোর প্রস্তাব যুক্তিসঙ্গত।”
বাংলাদেশের বিমা শিল্প এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে টিকে থাকতে হলে অভ্যন্তরীণ সংস্কার, কার্যকর নজরদারি ও গ্রাহকসেবায় কাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া বিকল্প নেই। বিমা দাবির সময়মতো নিষ্পত্তি, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতিমুক্ত পরিচালনা ও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্ল্যাটফর্ম ছাড়া এই খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে না।
নিরাপত্তাহীন ভবিষ্যতের আশঙ্কায় বিমা করার বদলে মানুষ বিমা কোম্পানিগুলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর এর সুযোগে একাধিক কোম্পানি ব্যবসার নামে প্রতারণা ও অস্বচ্ছ লেনদেন চালিয়ে যাচ্ছে। এখনই যদি নীতিগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই খাত পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

 


এ জাতীয় আরো খবর