দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারা দেশে রেকর্ড ৩৫২ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই রোগীর এমন ঊর্ধ্বগতি উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে চাপে ফেলার পাশাপাশি এটি শহর ছাড়িয়ে গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হওয়া ৩৫২ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে:
বরিশাল বিভাগে সর্বোচ্চ ১৬৭ জন
চট্টগ্রাম বিভাগে ৭৬ জন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৪৩ জন
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ১৯ জন
ঢাকা মহানগরের বাইরে ১৫ জন
রাজশাহীতে ২৪ জন
খুলনায় ৮ জন
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, ঢাকায় পরিস্থিতি এখনও গুরুতর থাকলেও বরিশাল ও চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।
২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ৭,৪২৯ জন।
এই সময়ে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১ জনে।
তবে আশার বিষয় হলো, একই সময় ৬,৫১৬ জন রোগী চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
ঢাকার একজন সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেহেদী হাসান বলেন, “বর্ষাকাল সামনে রেখে এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। বিশেষ করে বরিশাল ও চট্টগ্রামের মত জেলাগুলোতে যেখানে আগে এতোটা প্রকোপ ছিল না, এখন হঠাৎ করে রোগী বাড়া মানে আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট।”
তিনি আরও বলেন, “এই প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, এবার ডেঙ্গু শহর ছাড়িয়ে মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।”
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবারই বর্ষার আগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে অভিযান, মশানিধন কার্যক্রম ও জনসচেতনতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবায়নে নানা গাফিলতি থাকছে। সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা,পর্যাপ্ত মশক নিধন কর্মী না থাকা, এবং লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসা নিতে দেরি করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে:
ফুলের টব, ফ্রিজের পেছন, ব্যবহৃত টায়ার, ছাদে জমে থাকা পানি, এসির নিচে জমা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে বলা হয়েছে।
মশারি ব্যবহার, ঘুমানোর সময় ও শিশুদের জন্য বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গুর এই বাড়বাড়ন্ত এবার আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ নয়, জেলা-উপজেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে রোগটি। তাই কেবল চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা অভিযানকেই গুরুত্ব দিতে হবে সবচেয়ে বেশি।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সমন্বিত অভিযান ও তৃণমূল পর্যায়ে প্রচার জোরদার না হলে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।