পটুয়াখালী | ১২ জুন ২০২৫
পটুয়াখালীর উপকূলে দীর্ঘ ৫৮ দিনের অপেক্ষার পর যখন অবশেষে সাগরের বুকে পাড়ি জমালেন ইউনুস মিয়া, তখন তাঁর মনেও ছিল না-প্রথম জালেই ফিরবেন একরাশ আনন্দ নিয়ে। কুয়াকাটার অদূরে বঙ্গোপসাগরে জাল ফেলেই তিনি তুলে আনলেন ৪৩ মণ রুপালি ইলিশ, যার বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৬২ হাজার টাকা।
ঘটনা ঘটেছে বুধবার (১১ জুন) মধ্যরাতে, যখন সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ‘এফবি তামান্না’ নিয়ে গভীর সমুদ্রের উদ্দেশে যাত্রা করেন ১৯ জন জেলে। গন্তব্য-পায়রাবন্দর সংলগ্ন গভীর সাগর। জাল ফেলার পর পরই যে চিত্র উঠে আসে, তাতে অভিভূত হয়ে যান সবাই।
ট্রলারের মাঝি ইউনুস মিয়া বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম। নিষেধাজ্ঞা শেষে সমুদ্রে গিয়ে প্রথম জালেই এত ইলিশ উঠে আসবে, ভাবতেই পারিনি। এটা আমাদের জন্য এক বিশাল আশীর্বাদ।”
বৃহস্পতিবার সকালে, আলীপুর মৎস্য বন্দরের আবদুল্লাহ ফিস আড়তে নিলামের মাধ্যমে মাছগুলো বিক্রি হয়। ইলিশের এই বিশাল চালান কিনতে উৎসাহ ছিল ব্যাপক, দাম উঠেছে প্রায় ২১ লাখ টাকা। আড়তদার ও ক্রেতাদের মুখে হাসি, জেলেরা উল্লসিত।
ট্রলার মালিক ইউসুফ হাওলাদার, যিনি 'কোম্পানি হাওলাদার' নামেও পরিচিত, বলেন, “ধারদেনা করে ট্রলার রওনা করিয়েছিলাম। মাছ না পেলে চরম ক্ষতির মুখে পড়তে হতো। আল্লাহর অশেষ রহমতে শুরুতেই এমন সাফল্য এসেছে।”
সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে সাগরে মাছ ধরায় ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা ছিল। এই সময়কাল জেলেরা সচেতনভাবে সাগরে না গিয়ে বিশ্রাম নেন, যার ফলে ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা এ বিষয়ে বলেন, “এবারের নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে মানা হয়েছে। ফলে গভীর সমুদ্রে ইলিশের পরিমাণ বেড়েছে। প্রথম দিনেই জেলেরা যেভাবে মাছ পেয়েছেন, তাতে মনে হচ্ছে এই মৌসুমটি হবে অনেক আশাব্যঞ্জক।”
ইউনুস মিয়ার সাফল্যের খবরে কুয়াকাটা ও আলীপুর অঞ্চলে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। অন্য জেলেরা বলছেন, এটা শুধু একটি ট্রলারের সাফল্য নয়-পুরো উপকূলবাসীর জন্য আশার আলো।
স্থানীয় জেলে আলমগীর হোসেন জানান, “এই মৌসুমটা আমাদের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে আসতে পারত। কিন্তু প্রথম দিনেই এই রকম বড় ইলিশ ধরা পড়ছে, আমরা অনেক আশাবাদী।”
উপকূলীয় অঞ্চলে ইলিশ মৌসুম মানে শুধু মাছ ধরা নয়, বরং তা জড়িয়ে থাকে হাজারো মানুষের জীবিকা, স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা। ইউনুস মিয়ার এই এক রাতের সফলতা নতুন করে আশার বার্তা বহন করছে হাজারো হতাশ জেলের ঘরে।
এখন প্রশ্ন একটাই-এই ধারা কি বজায় থাকবে? সরকার, প্রশাসন, এবং জেলেরা যদি আরও সচেতন হন, তাহলে হয়তো সমুদ্র শুধু রূপালি ইলিশই নয়, ফিরে দিতে পারে শতশত উপকূলবাসীর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন।