মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন ইস্যু নতুন মোড় নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন অভিবাসীবিরোধী অবস্থানে আরেক ধাপ এগিয়ে গেছে। ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতির বাস্তবায়নে এবার প্রতিদিন ৩ হাজার অবৈধ অভিবাসী গ্রেফতারের লক্ষ্যে ময়দানে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা ইউএস ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই)।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, হোয়াইট হাউসের সরাসরি নির্দেশে এই নজিরবিহীন ধরপাকড় অভিযান চালানো হচ্ছে। মূল টার্গেটে রয়েছে পাঁচটি ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহর—নিউইয়র্ক সিটি, শিকাগো, সিয়াটল, ফিলাডেলফিয়া ও জ্যামিয়া (নিউ ইয়র্ক রাজ্যের উত্তরাঞ্চল)। এসব এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে সামরিক ঘরানার কৌশলগত ইউনিট, যারা ইতোমধ্যেই অভিযান শুরু করেছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে সম্প্রতি অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় গোটা প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। ফলে আইসিই তাদের দৈনিক গ্রেফতার টার্গেট ১০০০ থেকে এক লাফে ৩০০০-তে উন্নীত করেছে। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, বছরে এক কোটি (১০ লাখ) অভিবাসীকে আটক করে দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
প্রযুক্তি নির্ভরতায় আরও একধাপ এগিয়ে গেছে আইসিই। এবার ব্যবহৃত হচ্ছে অত্যাধুনিক অ্যাটাক (Alien Tracker) নামের একটি মোবাইলভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন, যা নির্বাসনের আদেশপ্রাপ্ত অভিবাসীদের দ্রুত শনাক্ত করতে পারদর্শী।
এই ‘হিট ম্যাপ’ সিস্টেমের মাধ্যমে কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক অভিযান পরিকল্পনা করতে পারছেন। সূত্রমতে, অ্যাপে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে প্রায় ৭ লাখ অভিবাসীর পূর্ণাঙ্গ তথ্য, যা শুধু আইসিই নয়, বরং সরকারের বিভিন্ন সংস্থার তথ্যভাণ্ডার থেকে একত্রিত করা হয়েছে।
আইসিইর সহকারী পরিচালক গ্যারেট জে. রিপা বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দ্রুত, নির্ভুল এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত ও অপসারণ। অ্যাপটি এই লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিচ্ছে।”
আইসিই এখন শুধুই সরকারি এজেন্টের ওপর নির্ভর করছে না। গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে ভাড়া করা হচ্ছে ‘কনট্রাক্ট স্পেশাল এজেন্ট’, যারা সপ্তাহের সাত দিন অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে চালু করা হয়েছে জনসাধারণের জন্য বিশেষ ‘টিপস লাইন’, যেখানে কেউ চাইলে অবৈধ অভিবাসী সম্পর্কে তথ্য দিতে পারেন।
গত মাসে এমন এক ফোন টিপের ভিত্তিতে বাল্টিমোরের একটি পার্কিং লট থেকে পাঁচজন অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সেই গ্রেপ্তারের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে আইসিই লিখেছে, “যখন আপনি আমাদের টিপ লাইনে কল করেন, আমরা শুনি।”
মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়া ও নেব্রাস্কার একাধিক খামার ও উৎপাদন কারখানায় হানা দেয় আইসিই। শ্রমিক সেজে সেখানে কর্মরত অনেক অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে।
ডেইলি মেইলের বরাতে জানা গেছে, “এই অভিযানগুলো এখন আর সাধারণ আইন প্রয়োগ নয়, বরং পরিকল্পিত এক অভিবাসন যুদ্ধের রূপ নিয়েছে।”
আইসিই’র মুখপাত্র অ্যাবিগেল জ্যাকসন এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির অন্যতম ভিত্তি হলো-আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করছি। বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।”
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী ইস্যু বরাবরই রাজনৈতিক বিভাজনের কেন্দ্রবিন্দুতে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই সামরিক কৌশল, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও প্রতিদিন হাজারো গ্রেফতার লক্ষ্য করে যে অভিবাসন নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা শুধু আমেরিকান রাজনীতি নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিমণ্ডলেও নতুন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, ডেইলি মেইল