শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬

ঐকমত্যের পথে বাংলাদেশ:তত্ত্বাবধায়ক সরকার,দ্বিকক্ষ সংসদ ও রাষ্ট্রপতি ক্ষমতা সংস্কারের ঐতিহাসিক সমঝোতা

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৫-০৫-২৭ ০০:৪৪:৫৫
ছবি সংগৃহিত

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম পর্যায়ের আলোচনা। সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সহ-সভাপতি বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো মৌলিক সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়ে ঐক্যমতের পথে এগোচ্ছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার: অবশেষে রাজনৈতিক ঐক্যমত্য
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রশ্নে কোনো রাজনৈতিক দল দ্বিমত পোষণ করেনি বলে জানিয়েছেন রীয়াজ। এটি এমন এক ইস্যু যা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক উত্তাপের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। এই প্রস্তাবের পক্ষে সর্বসম্মতি সম্ভবত একটি নতুন নির্বাচনী আস্থার ভিত্তি রচনা করতে পারে।

দ্বিকক্ষ সংসদের পথেও নীতিগত সম্মতি
সংবিধান সংস্কারের অংশ হিসেবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রস্তাবে অধিকাংশ দল নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব অনুযায়ী সেখানে ১০০ জন সদস্য থাকবেন। যদিও এই সদস্যরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন-সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত অনুপাতে না অন্যভাবে-সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি।
তবে একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব হলো, সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদটি বিরোধী দলের জন্য সংরক্ষণের ব্যাপারে সকল পক্ষই সম্মত হয়েছে। এ ছাড়া পাবলিক একাউন্টস ও প্রিভিলেজ কমিটির সভাপতিত্বও বিরোধী দলের হাতে ন্যস্ত করার বিষয়ে অধিকাংশ দল একমত।

নারী প্রতিনিধিত্বে ইতিবাচক গতি, তবে পদ্ধতিগত দ্বিধা
নারীদের জন্য ১০০টি আসন সংরক্ষণের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ ঐক্যমত্য রয়েছে, তবে এই সংরক্ষণ পদ্ধতি কেমন হবে তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা রয়ে গেছে।

সংবিধানের রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় পুনর্বিন্যাস
রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ এবং গণতন্ত্র’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবে ‘বহুত্ববাদ’ শব্দটি বাদ দেওয়ার পক্ষেই অধিকাংশ দলের মত। তবে অন্যান্য নীতিতে দলগুলোর মধ্যে বিস্তৃত ঐক্যমত্য লক্ষ্য করা গেছে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য
৪৮(ক) অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার পরিধি নির্ধারণ এবং ৭০ অনুচ্ছেদে কিছু নমনীয়তা আনার ব্যাপারেও গঠিত হয়েছে প্রাথমিক ঐক্যমত্য। দলীয় অনুশাসনের ক্ষেত্রে ‘অর্থ বিল’, ‘আস্থা ভোট’ এবং ‘সংবিধান সংশোধন বিল’-এ বাধ্যবাধকতা থাকবে বলেও অধিকাংশ দল সম্মত হয়েছে।

প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের বার্তা
জনপ্রশাসনে তিনটি পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশনের গঠন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিগত সমর্থন পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ‘দুর্নীতিবিরোধী ন্যায়পাল’ পদ সৃষ্টি ও বেসরকারি খাতেও ঘুষ লেনদেনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার ব্যাপারেও সম্মতির বার্তা দিয়েছে কমিশন।

বিচার বিভাগে ঐতিহাসিক সংস্কারের সুর
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, বিচারকদের ওপর নির্বাহী নিয়ন্ত্রণ অপসারণ, এবং ‘প্রবীণতম বিচারক’কে প্রধান বিচারপতি করার বিষয়ে অধিকাংশ দলের নীতিগত একমত হওয়ার খবর কমিশন দিয়েছে।
এছাড়া, রাজনৈতিক আনুগত্যকে বিচারকদের জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাবটিও পেয়েছে সর্বসম্মত সমর্থন।

নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে নীতিগত সনদপত্রের ভিত্তি
নির্বাচন কমিশনকে পূর্ণাঙ্গ আইনগত কাঠামোর আওতায় আনার প্রস্তাব, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দায়িত্ব কমিশনের হাতে ন্যস্ত করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর হিসাব ‘তথ্য অধিকার আইন’-এর আওতায় আনাসহ বহু সংস্কারের বিষয়ে একটি স্পষ্ট নীতিগত ঐক্য তৈরি হয়েছে।

সংবিধান রক্ষায় নতুন চুক্তির প্রস্তুতি
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে যেসব সংস্কার কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তাদের সুপারিশের আলোকে এখন একটি “জাতীয় সনদ” তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। ছয়টি কমিশনের প্রধান এবং প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে এই কমিশনের কাজ হলো আলোচনার ভিত্তিতে একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক-প্রশাসনিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করা।

বদলের পথে সম্ভাবনার আলো
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এই প্রাথমিক পর্যায়ের সংলাপ প্রমাণ করে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এক ধরনের পরিণতির পথে যাচ্ছে। মতভেদ থাকলেও, নতুন প্রজন্মের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ রাষ্ট্র কাঠামো গঠনের পথে এই সংলাপ হতে পারে যুগান্তকারী প্রথম ধাপ।


এ জাতীয় আরো খবর