আচ্ছা যদি এমন হতো,আজ থেকে বহু বছর পর , আবার কোন সাধারণ ঘরে জন্ম নিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর ,হঠাৎ করে তার সাথে দেখা হয়ে গেল তার নতুন বৌঠানের। তখন কি ওরা চিনতে পারবে দুজন দুজনকে ? ওদের অসমাপ্ত ভালোবাসা , কি পাবে পূর্ণতা ? ওরা কি জন্ম নিয়েছে আবার? দেখা কি হয়েছে ওদের ? নতুন করে সংসার পেতেছে ? নাকি আজও কাদম্বরীর অতৃপ্ত আত্মা খুঁজে ফিরছে তার ঠাকুরপোকে জোড়াসাঁকোর আনাচে, কানাচে কান পাতলে আজও কি শোনা যায় কাদম্বরীর চাপা দীর্ঘশ্বাস ? তার চাপা কান্না ?যাকে একরাশ ঘৃণা আর অপমান উপহার দিয়েছিল ঠাকুর বাড়ি। কিন্তু তার কি দোষ ছিল বলো? সে ঠাকুর বাড়ির বাজার সরকার শ্যামের মেয়ে জেনেই তো বিয়ে করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। তাহলে কেন এতো অবহেলা ? কেন অস্বীকার করেছিলেন কাদম্বরীকে ? কেন দিতে চাননি স্ত্রীর মর্যাদা ?
তাঁর যে বিয়ে হয়েছিল জ্যোতিরিন্দনাথ ঠাকুরের সাথে মন্ত্র উচ্চারণ । তাঁরা সাতপাকে ঘুরেছিলেন। আচ্ছা সবাই যে বলে ,বিয়ে হলো সাতজন্মের বন্ধন । এরকম অসম , অসুখী বিয়েও কি সাতজন্মের বন্ধনে আটকে থাকে ? তাহলে নতুন বৌঠানকে কি সাত জন্ম অপেক্ষা করতে হয়েছে তাঁর ঠাকুরপো কে পাওয়ার জন্য ? নাকি মুক্তি পেয়েছে, ভালোবাসা হীন , অসন্মানের জীবন থেকে , সাতজন্মের আগেই? পেয়েছে স্বাধীনতা ? কি জানি ? তবে মৃত্যু ছাড়া কি আর কোন রাস্তা ছিল না নতুন বৌঠানের মুক্তির ? আসলে ভালোবাসার মানুষ যদি বদলে যায়, চোখের সামনে অন্য কারো হয়ে যায়, সে যন্ত্রণা মনে হয় সহ্য করা যায় না। পরিনতি এমনই হয়।
" এই শোন রাই ,তোর ঐ এক ঘ্যান ঘ্যানানী আর শুনতে ভালো লাগে না। সারাক্ষণ শুধু কাদম্বরী আর রবিঠাকুর। মনে হয় তুই যেন সেই কাদম্বরী। এমন হাবভাব করিস ! তোর এতো বিরহ কিসের রে ? পারিসও বাবা ! " বলে মুসকান।
"চলনা একদিন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে যাই। এতো কাছে কিন্তু কোনদিন যাওয়া হয়নি। ঠাকুর বাড়ি যাকে অস্বীকার করলো, যাকে বৌ করে এনেও বৌয়ের মর্যাদা দিলো না, যে তিলে তিলে শেষ হয়ে গেল , তাকে তো কোনদিন আর দেখতে পাবো না। অন্তত তিনি যে বাড়িতে অবহেলিত হয়েছেন, স্বামীর ভালোবাসা পাননি , স্বাধীনতা পায়নি , যিনি চার দেওয়ালের মধ্যে একটু একটু করে শেষ করেছেন নিজেকে ,সেই যন্ত্রণার মহলটা একটু ঘুরে দেখে আসি। ঠাকুর বাড়ির অন্দরমহলে সে কিভাবে ছটফট করতে করতে না পাওয়ার যন্ত্রণায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল। ভাবতেই খুব কষ্ট হয় রে। "-- বলে রাই।
রাই , তনয়া, সুতপা , মুসকান চারজন মিলে আজ এসেছে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। এই বাড়িতেই দু'দিন ধরে পড়েছিল কাদম্বরীর নিথর দেহ। যে ভালোবাসা তাঁকে পৃথিবী ছাড়া করলো , সেই ভালোবাসার মানুষ কখনো তাঁর মন বুঝেছিল কিনা জানা নেই। সব ভুলে স্বামীকে কাছে পাওয়ার জন্য সে শেষবারের মত সেজেছিল বধূবেশে । কিন্তু স্বামী ফিরে আসেনি।
একটু একটু করে এগিয়ে যায় রাই। এইতো কাদম্বরীর ঘর। ঐ তো সেই বাগান। সেখানে সে রবির সাথে কত দুষ্টুমি করেছে,কত নিস্তব্ধ দুপুর তাদের কেটেছে এখানে কবিতা পড়ে ,খুনসুটি করে । নতুন বৌঠানকে কবিতা শোনাতো তাঁর ঠাকুরপো এই বাগানেই। আবার কখনো দোলনায় দোল খেতো । তারা ছিল খেলার সাথী। কিশোর কবি কোনকিছু লিখেই আগে তাঁর নতুন বৌঠানকে দেখাতো। সেই কবি আস্তে আস্তে বদলে গেল। তিনিও কি অস্বীকার করেছিলেন নতুন বৌঠানকে। আজও সেই প্রশ্ন ঘুরছে ঠাকুর বাড়ির অন্দরে । প্রতিটি কড়িকাঠে ধাক্কা খেয়ে ফিরছে কাদম্বরীর অনুচ্চ হাহাকার। রাই যেন চোখের সামনে সব দেখতে পাচ্ছে কাদম্বরীর মৃত্যু যন্ত্রণা।
মৃণালিনী দেবীর সাথে বিয়ের পর , তাঁর ঠাকুরপো বদলে যেতে শুরু করে। ব্যাপারটা স্বাভাবিক হলেও মেনে নিতে পারে না কাদম্বরী। স্বামীর অবহেলা,(কথিত আছে বিনোদীনির সাথে সম্পর্ক ছিল জ্যোতিরিন্দ্রনাথে) তাকে সময় না দেওয়া সব ভুলিয়ে রেখেছিল রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু তাঁর বিয়ে হয়ে যাওয়া বড় একা হয়ে যান কাদম্বরী। সেই প্রতিটি দুপুর যেন তাঁকে দানবের মত গিলতে আসতো। আগে এই দুপুর গুলো কাটতো রবীর সাথে কবিতা পড়ে।
কাদম্বরী শেষ বারের মত তাঁর প্রিয় ফুলের টবে জল দিলেন , নিজের নাম লেখা হাত পাখাটা যত্নে সাজিয়ে রাখলেন বালিশের উপর, রবির লেখা চিঠি গুলো ছড়িয়ে রাখলেন বিছানার উপর। আর তো লুকোনোর কিছু নেই । তারপর দরজা বন্ধ করলেন। লুটিয়ে পড়লেন বিছানায়। আস্তে আস্তে থেমে গেল তার হৃদস্পন্দন। শেষ হলো সব যন্ত্রণার। ভাবতে ভাবতে দু'চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে রাইয়ের।
ঠাকুরবাড়ির সব কিছু ছেড়ে রাইয়ের যেন কাদম্বরীর জন্য মন কেমন করে ওঠে। সেও মেয়ে। তাই সে বোঝে ভালোবাসা হারানোর যন্ত্রণা। যদি তাঁর স্বামী তাঁকে ভালোবাসতো, সময় দিতো, অস্বীকার না করতো তাহলে হয়তো অকালে এভাবে একটি প্রান চলে যেত না। জানিনা কার ভুলে এতোবড় ক্ষতি হয়েছিল ? তবে কাদম্বরী মুক্তি পেয়েছিল। পেয়েছিল অনন্ত আকাশে ওড়ার স্বাধীনতা। কিন্তু ভুলতে কি পেরেছিল তাঁর ঠাকুরপোকে ? অপরিনত বয়সে কাদম্বরীর বাল্যসখা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাল্যপ্রেম পরিনতি পায়না।
ফিরে এসো হে প্রিয়তমা । তোমার প্রিয়তম অপেক্ষা করে আছে আজও।-- ঠাকুর বাড়ির অন্দরে যেন এই হাহাকার আজও ধ্বনিত হয়ে চলেছে যুগ যুগান্ত ধরে। কাদম্বরী যেন মরেই প্রমাণ করলো সে একদিন জীবিত ছিল। সে যখন বেঁচে ছিল তখন কেউ তাঁর কথা ভাবেনি। আজ সবাই জানে তাঁর যন্ত্রণার কথা।
অনেক চেষ্টা করেও কাদম্বরীকে বাঁচানো যায়নি। তাঁকে শেশ মুহূর্তে বাঁচানোর জন্য ঠাকুর বাড়ি যে পদক্ষেপ নিয়েছিল, বেঁচে থাকতে একটু যদি তাকে সবাই বুঝতো তাহলে কাদম্বরীর এই পরিনতি হতোনা।
ভাবতে ভাবতে ওরা বেরিয়ে আসে ঠাকুর বাড়ি থেকে। মনটা আজ বড় উতলা রাইয়ের। গাড়িতে উঠতে যাবে হঠাৎ যেন সে শুনতে পায় কেউ চিৎকার করে ডাকছে " নতুন বৌঠান যোয়ো না , দাঁড়াও। আমি আসছি।" যদিও এটা মনের ভুল। তবুও কোথাও কি কাদম্বরীর সত্যিই কি রবিঠাকুর আজও ডাকছেন এভাবে তাঁর প্রিয়তমাকে ? কাদম্বরী কি আবার জন্ম নিয়েছেন ? নাকি আজও একজন ব্যর্থ প্রেমিকা হয়ে ঘুরছে ঠাকুর বাড়ির আনাচে কানাচে ?
গাড়ি ছেড়ে দেয়। একটা ছায়ামূর্তি কি সরে গেল পিছন থেকে ?