মঙ্গলবার, আগস্ট ১৮, ২০২৬

প্র দী প গু প্ত

  • ভারতবর্ষ
  • ২০২৫-০৪-০৩ ১৩:৩৩:৩৮

হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে চিৎকার করে উঠছিলেন 
একজন বিএসএফ জওয়ান
লম্বা ছিপছিপে, মেদহীন শরীর।
একহাতে ধরা কর্ডহীন মাইক্রোফোন।
কখনও হাততালি দিয়ে, কখনও বা নেচে 
সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করছিলেন সবাইকে
জয়ধ্বনি করছিলেন ভারতমাতার।

গ্যালারীতে বসা হাজার চল্লিশেক মানুষ
ওর সাথে সাথে চিৎকার করে উঠছিলেন।
ভারতমাতার জয়ধ্বনিতে ফেটে পড়ছিল আকাশ বাতাস।
গালে, কপালে, বাহুতে, গলায় যে যেখানে পেরেছে
তেরঙা রঙে রাঙিয়ে নিয়েছে নিজেদের।
ছোট, মাঝারি, বড়ো নানান মাপের তেরঙ্গা পতাকা 
পতপত করে উড়ছে হাতে হাতে।
গলায় জড়ানো পতাকা, 
উত্তরীয়র মতো গলায় ঝুলছে ত্রিবর্ণরঞ্জিত বস্ত্রখণ্ড।
মানুষ নাচছে, মানুষ গাইছে, আর সেই জওয়ান
প্রাণপণ চিৎকার করে বলে উঠছেন - হিন্দুস্থান জিন্দাবাদ, ভারতমাতা কি জয়, বন্দে মাতরম
সাথে সত্তর আশী  হাজার কন্ঠে গর্জন উঠছে -- হিন্দুস্থান জিন্দাবাদ, বন্দে মাতরম।
অন্যদিকের গ্যালারী শুনশান। হাতে গোনা দুচার হাজার মানুষ বসে আছেন গ্যালারিতে,
জয়ধ্বনি দিচ্ছেন তাদের দেশমাতৃকার।

আমিও অনেকদিন - অনেক মাস - অনেক বছর বাদে
টগবগ করে ফুটছিলাম।
কোনো উত্তেজনায় না। 
বিশুদ্ধ প্রেমে।
যে প্রেম ধীরেধীরে আমার মন থেকে, আমার বোধ থেকে
আমার চেতনা থেকে, আমার যাপন থেকে ক্রমশ
প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর মতো হারিয়ে যাচ্ছিলো,
আমি ক্রমশ খুঁজে পাচ্ছিলাম আমার গহনে
সুপ্ত থাকা সেই প্রেম। আমার মহান দেশ, যে দেশ আমায় খাইয়েছে, আমায় পড়িয়েছে, আমার সন্তানদের প্রতিপালনের অর্থ জুগিয়েছে, সেই দেশের প্রতি আমার এতোদিনের অবহেলা ক্রমশ সাপের ফনার মতো ফুলে উঠে আমার জড় চেতনায় দংশন করছিলো বারেবারে। 
আমিও আবেগে উত্তেজনায় মাঝেমাঝেই দাঁড়িয়ে পড়ছিলাম
চিৎকার করে উঠছিলাম।
আমার সযত্ন লালিত লোভ, অন্যের মুখের গ্রাস
কেড়ে নেওয়ার অভ্যাস, দখলদারি, উপঢৌকন,
উৎকোচ, দেশের মানুষদের ঠকিয়ে নিজের সম্পদ বাড়িয়ে তোলার প্রবৃত্তি, 
আমার সমস্ত অসামাজিকতার অসুখগুলো ক্রমশ 
দেশপ্রেমের হাওয়ায় শরৎকালীন মেঘের মতো ক্রমশ সরে সরে গিয়ে 
নীল করে তুলছে মনের আকাশ, ঠিক সেই মুহূর্তে পশ্চিমাকাশ রাঙা করে 
সূর্যদেব বিশ্রাম নিতে ঢলে পড়লেন।
দুদেশের জওয়ানেরা পতাকা অবনমিত করছেন,
আমি নেমে এলাম রাস্তায়।
পুরোনো আমির ভেতর জন্ম নিয়েছে এক নতুন আমি
একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক। পরার্থে জীবন উৎসর্গ করার মন্ত্রে দীক্ষিত এক অচেনা মানুষ।
এককাপ কফি অর্ডার দিয়ে সবে চিকেন প্যাটিসে দাঁত বসাতে যাবো, 
একটা আধা ন্যাংটো শিশু আমার দিকে জুলজুল করে তাকিয়ে হাত বাড়িয়েছে।

প্রবল ঘৃণায় আমার চোখদুটোকে সরিয়ে নিলাম শিশুটির থেকে। 
কফি না খেয়েই তড়িঘড়ি হাঁটা লাগালাম কার পার্কিংএর দিকে।
পেছনে পড়ে রইলো হাড় জিড়জিড়ে, অভুক্ত,নীতিহীন, আদর্শহীন,বঞ্চিত এক পুরোনো ভারতবর্ষ।


এ জাতীয় আরো খবর