একটু অন্যমনস্ক হলেই ট্রেনটা আসে। এই ট্রেনের কোনও হর্ন নেই। বস্তুত বাকি শরীরটাও নেই। শুধু একটা জানলা আছে। আর মুখোমুখি দুটো সিট।
একটু অন্যমনস্ক হলেই ট্রেনটা আসে। কত বছর ধরে আসছে। তুমি চলে যাওয়ার পর। পড়াশুনোর জীবন শেষ হয়ে গেলে মানুষের জীবন নানা গোলমালে পড়ে যায়। মানুষের মধ্যে যে পাখির জীবনটা থাকে, তাকে আর বাঁচতে দেওয়া হয় না। যতক্ষণ না পাখিটা মরছে, মানুষের জীবন অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান পাবে না। মানব সভ্যতা বড় নির্মম। পাখিকে মেরেই এই সভ্যতা তৈরি হয়েছে।
যাই হোক, একটু অন্যমনস্ক হলেই ট্রেনটা আসে। খুব কাঁদতাম প্রথম-প্রথম। যন্ত্রণায় নীল হয়ে যেতাম। তারপর একসময় কাঁদতাম, কিন্তু যন্ত্রণায় নীল হতাম না। এখন কাঁদিও না, যন্ত্রণাও পাই না, শুধু অপেক্ষা করি। অন্যমনস্কতার জন্য অপেক্ষা করি। ট্রেনটার জন্য অপেক্ষা করি। মুখোমুখি দুটো সিটের জন্য অপেক্ষা করি। তখন শীতকাল। জানলার বাইরে যতদূর চোখ যায়, হলুদ সর্ষেফুলের ক্ষেত।
জানলার বাইরে দু’জনের চোখ। কেউ কাউকে দেখছি না। ট্রেনের ভেতরে কয়েকটা কথা খেলা শুরু করেছে। আজীবনের খেলা।
‘পালিয়ে এসেছিলাম। তোমার কবিতার ক্ষতি হবে, তাই ফিরে যাচ্ছি।’
---তুমিই কবিতা।
---তাহলে? চুপ করে আছ কেন? কিছু বলো!
---বিশ্বাস করো মানুষের জীবনে কবিতা আসে, কিন্তু ফিরে যায়। মানুষ কোনওদিন কবিতা লিখতে পারবে না। মানুষ যে পাখি মেরেছে! কবিতা লেখার নামে নিজেকে ভুল বোঝানো কিছু কথা লেখে মানুষ। আর কিছু না। আর কিছু না। …তুমি কি কাঁদছ, আমার কবিতা?’
ট্রেনটা হলুদ সর্ষেফুলের ক্ষেতে ডুবে যায়। আবার যে-কোনও সময় নিঃশব্দে ফিরে আসবে।