করোনা থেকে আমার ফিরে আসার গল্পটা অনেকটা রূপকথার মত। সেই ছোটবেলার গল্পে যেমন থাকতো.. রাজকন্যা বনবাসে গিয়ে হারিয়ে যেত! অতঃপর অনেক দিন পর ফিরে আসা!
সে রকম ভাবে শুরু হল আমার আইসিইউ, কোমা, ভেন্টিলেশন, হাই ফ্লো অক্সিজেনের যাত্রা! আমার এখনও মনে পড়ে, আইসিইউতে নেওয়ার আগে আমি প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে এইচডিইউর মুঠোফোন থেকে আমার প্রিয় মানুষটাকে ফোন দিয়েছিলাম। শুধু শেষ বারের মত তার কন্ঠটা শোনার জন্য। সে আমাকে তার কান্নাজড়িত কন্ঠে ক্রমাগতভাবে শুধু আশার বাণী, অভয় দিয়ে যাচ্ছিলো। যদিও আমরা দুজনই জানতাম হয়তোবা এটাই আমাদের শেষ কথা!
তারপর... শুধুই অন্ধকার। ছিল ডাক্তারদের অক্লান্ত পরিশ্রম, শুরু হল প্রিয়জনদের অপেক্ষা ও প্রতীক্ষার পালা। প্রতিদিন আমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ হতে থাকলো। লানের ৯৬% ইনভল্ভমেন্ট! এবার শুধু আমার প্রিয় মানুষটির আইসিইউর বাইরের মনিটরের ক্যামেরায় তাকিয়ে থাকার পালা, আমাকে যেন একটু দেখতে পায় তার জন্য অপেক্ষার প্রহর গোনা। আর প্রতিদিন ডাক্তারের বেঁধে দেয়া সময়ে ভালো মন্দের ব্রিফিং শোনা! জীবনের এতগুলি বছর পার করেছি, সুখে দুঃখে কেউ কারও হাত ছাড়িনি। অথচ এখন যোজন যোজন দূরে দুজন দুজায়গায়। দেখা নেই, কথা নেই, মান অভিমান, অভিযোগ, অনুযোগ নেই! কি এক শূন্যতা, অসহায়ত্ব! আর ভেন্টিলেশনে থাকা আমার শরীর যেন এক গবেষণাগার। এক সময় বলা হল সৃষ্টিকর্তা চাইলে কি না হতে পারে! অবশ্যই তিনি যা চান তাই হয়। ডাক্তার সহ সবাই যেন এক মিরাকলের অপেক্ষায়!
অতঃপর কয়দিন হল এখানে শুয়ে আছি! রাত, দিনের কোন হিসাব নেই আমার। পৃথিবীর আলো দেখতে পাইনি অনেক দিন। চোখে বহুদিন আলো পৌঁছায়নি, চোখ বাঁধা ছিল। চোখ খোলা হল আমার...!
এখনো মনে পড়ে ডাক্তার নার্সদের প্রশ্ন করতাম, এখন কটা বাজে? এখন রাত না দিন! আমার প্রচন্ড খিদে, কিছু খেতে দিন। ওনারা বলতেন আপনি তো খাচ্ছেন টিউবে! কি আশ্চর্য, বলা মাত্রই নিজের শরীরে টের পেলাম নাক, গলা থেকে পা পর্যন্ত অসংখ্য যন্ত্রপাতি আর তারে জড়ানো আমি! মনিটরের বিপের শব্দে চমকে উঠি! আমি যেন এক জীবন্ত লাশ!
চোখে ভাঁসে কিছু প্রিয় মানুষের চিরচেনা মুখ। প্রিয় স্বামী, ভাইবোন, আমার বোনদের চার সন্তানের কচি মুখগুলি, আত্মীয় স্বজন, অনুজ, অগ্রজ, বন্ধুবান্ধব, আমার আত্মার কিছু প্রিয় মানুষের মুখ। কৃতজ্ঞতায় চোখ ভিজে যায় আমার মহান সৃষ্টিকর্তার জন্য।
এত মানুষের ভালোবাসা যে মানুষগুলিকে আমি হয়তোবা জীবনে কখনও দেখিনি, যে মানুষগুলি আমার আত্মার, পরম ভালোবাসার, যে মানুষগুলি আমার রক্তের, সবার সম্মিলিত চেষ্টায় দোয়া, ভালোবাসা, প্রার্থনা, সাহায্য, সহযোগিতায়, রক্ত দানে মহান সৃষ্টিকর্তা আমাকে আবার নতুন ভাবে পৃথিবীর বুকে জীবন দান করেছেন। আপনাদের /তোমাদের /তোদের প্রতি আমার অনেক অনেক ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই।
আলহামদুলিল্লাহ আমি এখন অনেক ভালো আছি যদিও এখনও কিছু শারিরীক জটিলতা রয়েছে। এখনও মেডিসিন যোগ বিয়োগ হচ্ছে, ডোজ বাড়ানো, কমানো তো আছেই। টেস্ট তো চলছেই। এখনও সাবধানে থাকতে হবে আরও বেশ কয়েক দিন।
এখনও যেতে হবে অনেক দূর...!