শুক্রবার, মে ৩১, ২০২৪

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অসাধারণ মেধাসম্পন্ন গুণি অভিনেত্রী ছিলেন রওশন জামিল

  • এ কে আজাদ
  • ২০২৪-০৫-১৪ ০৯:১২:১২

রওশন জামিল। নৃত্যশিল্পী-অভিনেত্রী।অসামান্য প্রতিভাময়ী একজন নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যশিক্ষিকা ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অসাধারণ মেধাসম্পন্ন গুণি অভিনেত্রী ছিলেন। একজন উচুমানের অভিনেত্রী হিসেবে তিনি সকলের কাছে ছিলেন- প্রসংশিত ও জনপ্রিয়। অভিজাত পরিবারের রাগী মা, দজ্জাল শ্বাশুড়ি-বড় বোন-ভাবী, মমতাময়ী মা-নানি-দাদী যে কোনো চরিত্রে, যে কোনো ভূমিকায় অভিনয় করার বাস্তবিক প্রতিভা ও অসাভাবিক দক্ষতা ছিল তাঁর।
আমাদের দেশের প্রখ্যাত অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী রওশন জামিল-এর মৃত্যুবার্ষিকী আজ । তিনি ২০০২ সালের ১৪ মে, ঢাকায়  মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। প্রয়াত এই গুণি অভিনেত্রী-নৃত্যশিল্পীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
রওশন জামিল ১৯৩১ সালের ৮ মে,  ঢাকার রোকনপুরে, জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম ডাঃ এম এ করীম এবং মায়ের নাম মোসামৎ হুসনে আরা করীম। তাঁরা ছিলেন চার ভাই, চার বোন। তাঁর বোনদের মধ্যে আল্পনা মুমতাজ বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান নৃত্য শিল্পী।


তিনি ঢাকার লক্ষীবাজারের 'সেন্ট ফ্রান্সিস মিশনারী স্কুলে' প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপরে পড়াশুনা করেন ইডেন কলেজে।
শৈশব থেকেই রওশন জামিলের নাচের প্রতি ঝোঁক ছিল। ম্যাট্রিক পাশ করার পর নাচ শেখার জন্য ভর্তি হন ঢাকার ওয়ারী শিল্পকলা ভবনে। প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী ও নৃত্যশিক্ষক গওহর জামিল-এর কাছ থেকে তিনি নাচের তালিম নেন । পরে তিনি ভারত থেকে নৃত্যের উপর ডিপ্লোমা করেন।
 জানা যায় রওশন জামিল সেসময়ে নৃত্যের পাশাপাশি মঞ্চনাটকেও অভিনয় করেন। পঞ্চাশদশকের শুরুর দিকে তিনি জগন্নাথ কলেজে মঞ্চায়িত শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন।
রওশন জামিল নৃত্যশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও, এক সময় পেশাদার অভিনেত্রী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি ঢাকা বেতার কেন্দ্রে প্রথম অভিনয় করেন। এরপর ১৯৬৫ সালে প্রচারিত 'রক্ত দিয়ে লেখা' নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর প্রথম টেলিভিশনের নাটকে অভিষেক ঘটে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের 'ঢাকায় থাকি' ও 'সকাল সন্ধ্যা' ধারাবাহিক নাটক তাঁকে প্রভূত জনপ্রিয় করে তোলে।টেলিভিশনে তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটক- কুল নাই কিনার নাই, রাক্ষুসী, পালাবদল, মহাপ্রস্হান, নন্দিত নরকে, সকাল সন্ধ্যা, সময় অসময়, ঢাকায় থাকি, তালা, কিছু তো বলুন, কুসুম প্রভৃতি ।
টেলিভিশনে অভিনয় জীবন শুরু করলেও পরবর্তিতে চলচ্চিত্রেই তাঁকে বেশি দেখা গেছে। রওশন জামিল ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, নজরুল ইসলাম পরিচালিত 'আলিবাবা' ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন। তিনি আরো যেসব ছবিতে অভিন করেন তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- গোরী, গীত কাঁহি সঙ্গীত কাঁহি (উর্দু), মনের মত বউ, টাকা আনা পাই, জীবন থেকে নেয়া, সুখ-দুখ, দর্পচূর্ণ, ওরা ১১ জন, আবার তোরা মানুষ হ, তিতাস একটি নদীর নাম, অধিকার,  সাহেব বিবি গোলাম,  সুজন সখী, আগুন, সূর্য গ্রহণ, নয়নমনি, জননী, অনন্ত প্রেম, গোলাপী এখন ট্রেনে, বধূ বিদায়, আসামী, সূর্যসংগ্রাম, মিন্টু আমার নাম, ওয়াদা, সূর্য দীঘল বাড়ী, চোখের মনি, মাটির ঘর, অংশীদার, মিন্টু আমার নাম, শেষ উত্তর, চিৎকার, কলমীলতা, দেশবিদেশ, জীবন মৃত্যু, নদের চাঁদ, মাটির কোলে, বাঁধনহারা, মহানগর, দেবদাস, লাল কাজল, আশার আলো, পেনশন, মৎস কুমারী, রামের সুমতি, দহন, আগামী (স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র), মিস ললিতা, মীমাংসা, আলীবাবা ৪০ চোর, আমার সংসার, বেদের মেয়ে জোসনা, বউ শ্বাশুড়ী, ফুলেশ্বরী, স্ত্রীর পাওনা, শঙ্খনীল কারাগার, জুলি, অবুঝ সন্তান, চিত্রা নদীর পারে, বালিকা হলো বধূ, পোকামাকড়ের ঘরবসতি, শ্রাবণ মেঘের দিন, প্রেমের তাজমহল, লালসালু, একটি নদীর নাম,  ইত্যাদি।
তিনি বেশ কয়েকটি বিজ্ঞাপনচিত্রেরও মডেল হয়েছিলেন।
চলচ্চিত্র তথা সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য রওশন জামিল দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। যারমধ্যে উল্লেখযোগ্য- নয়নমনি (১৯৭৬) ও সূর্য দীঘল বাড়ী (১৯৭৯) চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য, শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রের অভিনেত্রী হিসেবে 'জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার'। নৃত্যশিল্পে অবদানের জন্য, একুশে পদক-১৯৯৫ লাভ । এছাড়াও পেয়েছেন- বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার, তারকালোক পুরস্কার, টেনাশিনাস পদক, সিকোয়েন্স অ্যাওয়ার্ড-সহ অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার ।
 ব্যক্তিজীবনে রওশন জামিল ১৯৫২ সালে, প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী-শিক্ষক এবং চলচ্চিত্র অভিনেতা গহর জামিলের সংগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের ২ ছেলে, ৩ মেয়ে রয়েছে। বড় মেয়ে কান্তা জামিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় একজন নৃত্যশিল্পী।


১৯৫৯ সালে, নৃত্যশিল্পী গওহর জামিল ও রওশন জামিল দুজনে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন নৃত্য প্রশিক্ষন কেন্দ্র 'জাগো আর্ট সেন্টার'। এখান থেকে তৈরী হয়েছে দেশের অনেক বিশিষ্টসব নৃত্যশিল্পী।
অসামান্য প্রতিভাময়ী নৃত্যশিল্পী ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অসাধারণ মেধাসম্পন্ন গুণি অভিনেত্রী রওশন জামিল নানা ধরণের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। শুধু খলচরিত্রেই নয়, চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে যে কোনো চরিত্রে অভিনয় করার দক্ষতা ছিল তাঁর। সহজ-সরল আদর্শবান সন্তানের জন্য আঁকুতি- বাংলার স্নেহময়ী এমন সব মা, মমতাময়ী দাদি-নানি, এসব চরিত্রেও তিনি অনবদ্য অভিনয় করে গেছেন, সহজ ও সাবলিলভাবে। বহুমুখী অভিনয় প্রতিভায় ভাস্বর, খুবই উঁচুমানের গুণি এই অভিনেত্রী- অসহায় বুঁড়ি, ঝাড়ুদারনি, ভিক্ষুক ও পাগলীর চরিত্রসহ নানাবিধ ভূমিকায়, অভিনয় করে একজন জাত অভিনেত্রীর স্বাক্ষর রেখে গেছেন, অনবদ্য সৃজনশীল অভিনয়ের মাধ্যমে।
একজন অত্যান্ত সফল অভিনেত্রী, একজন অনুকরণীয়-অনুস্মরণীয় আজন্ম শিল্পী রওশন জামিল। 
রওশন জামিল শারীরিকভাবে চলে গেছেন আমাদের মাঝ থেকে, কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর কর্ম ও জীবন। তিনি সমৃদ্ধ করে গেছেন আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প তথা শিল্প-সংস্কৃতিকে। আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প তথা শিল্প-সংস্কৃতির মাধ্যমের কর্মীরা যতবেশী তাঁর মতো গুণি নৃত্যশিল্পী-অভিনেত্রীকে অনুসরণ করবেন, তাঁর কর্ম নিয়ে চর্চা করবেন, ততবেশী সমৃদ্ধ হবে আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প তথা শিল্প-সংস্কৃতি।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প তথা শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন- কিংবদন্তীতুল্য অভিনেত্রী ও নৃত্যশিল্পী রওশন জামিল।


এ জাতীয় আরো খবর