সর্বহারা আর ভিখারী কী সমার্থক! কিংবা জানতে চাই, ভিক্ষুকরা কী সর্বহারা?
আমার বোধগম্য হয় না।
সর্বহারারা খেটে খায়। প্রয়োজনে চুরি ডাকাতি ধাপ্পাবাজি করে। সহজে হাত পাতে না।
কিন্তু ভিখারীরা ঠিক উল্টো স্বভাবের। এরা কাজ করতে নারাজ। অবলিলায় ভিক্ষা মাঙ্গে। অসহায়ের ভান করে সর্বহারাদের সঙ্গে মিশে থাকে।
অনেকটা ঝাঁকের কৈয়ের মতন; খৈলসা-ভেদা আলাদা করা যায় না।
ব্যাপারটা আমার মাথায় ছিল না তেমনভাবে; যদি না ভ্যাবলা ফকিরকে জানতে পারতাম।
লোকটা খুব বুড়ো নয়; অথচ পার্কে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা মাঙ্গে!
বয়াতীরা গান শোনায়। কেউ কিছু দিলে গোপনে নেয় বটে; গায়েন পরিচয়কে উর্ধে তুলে ধরে।
লোকটা ফকির-বয়াতী মোটেই নয়। তাকিয়ে দেখি, পার্ক জুড়ে অনেক ভিক্ষুক। নারী-পুরুষ উভয় লিঙ্গের। ভিক্ষা না পেলে এরা লোকজনকে গালিও দেয়।
ভ্যাবলার কাছে জানতে চাই--তুমি কোনো কাজ করলেতো পারো?
ভ্যাবলা হাসে--কামাই করার নামইতো কাম। কামাই কইরাইতো খাই। চুরিতো করি না।
থাকো কোথায়? রাতে পার্কেতো দেখি না!
পর্কে থাকে দিনমজুররা। আমার ঘর আছে। ঘরে থাকি।
বলো কী!
অবাক হয়ে দেখি, ভিক্ষুকদের একজনও পথে-ঘাটে থাকে না। দিনশেষে কোথায় যেন চলে যায়।
ভ্যাবলা হাসে--ভাই, এইডা একটা ব্যবসা। লস নাই; পুরাটাই লাভ। নগদ টাকার নেশায় পড়লে আপনেও এই কাম করবেন।
দুপুর বেলায় দেখি, ভ্যাবলা ফকির ফুটপাতের এক দোকানদারের সঙ্গে তর্কাতর্কি করছে।
ঝগড়া এমন পর্যায়ে যায়, ছেলেটাকে মারতে ওঠে ভ্যাবলা।
ঘটনা কী!
ভ্যাবলা বলে--ভাই, আমি অর দোকানে টাকা লাগাইছি। কথা আছিল, দিনে একশ কইরা দেবে। অহন দেহেন কেমন পাল্টি লইতাছে! আম-ছালা দুইটাই যায় যায় দশা...।
দোকানদার ছেলেটা চিৎকার করে ওঠে--নামে ভ্যাবলা হইলে কী হইবো! তুইতো শালা এনজিওঅলাগো চাইতেও পিশাচ...।
আশ্চর্য হয়ে দেখি, ভিক্ষা একটা ব্যবসা। পড়ন্ত বিকেলে পার্কের ভিক্ষুকরা কাঠাল তলায় বসে টাকা গোনে। তখন ওদের কীযে হাসিখুশি দেখায়!
ওদের ঘর আছে। সুখ-দুঃখ আছে। লগ্নিকৃত টাকা মার যাওয়ার ভয় আছে। সর্বহারার এসব কিছুই নেই।
সকাল বেলায় ভ্যাবলা ফকিরকে দেখি, রিক্সা থেকে নেমে চা খেয়ে পয়সা না দিয়ে দোকানীর দিকে তাকিয়ে হে হে করে হাসতেছে।
দোকানী তাড়া দেয়--যা ভাগ। ভিক্ষুক কাঁহেকা।
ভ্যাবলা একটু এগিয়ে এক যুগলের সামনে হাত পাতে।
মেয়েটা টাকা বের করে ভ্যাবলার হাতে দেয়। ওরা সরল মনে বলে--দোয়া করো, বাবা।
ভ্যাবলা মনে মনে বলে--শয়তান ছেড়ি কোহানকার। রাইত না পোহাইতেই নাগর লয়া চইলা আইছস...।
ভিক্ষুকরা সর্বহারা কি-না সন্দেহ। তবে এরা সর্বহারাদের ভিতর ঝাঁকের কৈয়ের মতন মিশে থেকে পয়সা কামায়।