সকালের আলো ডট কম
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্য ও মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো অবস্থানে এগিয়ে যাচ্ছে ইরান। দেশটিকে উদীয়মান মহাকাশ শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা (ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি-ডিআইএ)। পেন্টাগনের প্রকাশিত এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামরিক ও বেসামরিক মহাকাশ কর্মসূচি সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্যাটেলাইটভিত্তিক প্রযুক্তি মোকাবিলায় নিজেদের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে তেহরান।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে তুরস্কের সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সি।
ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের অপারেশন এপিক ফিউরি চলাকালে ভূমিভিত্তিক জ্যামিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্যাটেলাইটনির্ভর জিপিএস সংকেত ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে তেহরান। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশভিত্তিক সামরিক সক্ষমতার বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার সামর্থ্য প্রদর্শন করেছে দেশটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী,সামরিক সক্ষমতা জোরদার,অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জাতীয় মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইরান তাদের মহাকাশ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করছে। বিশেষ করে নেভিগেশন, লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণ এবং সামরিক যোগাযোগব্যবস্থায় মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি।
যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (এইআই) মহাকাশবিষয়ক তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বর্তমানে প্রায় এক ডজন কার্যকর কৃত্রিম উপগ্রহ রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা ইরানের তুলনায় এক হাজার গুণেরও বেশি। তবে সীমিত সংখ্যক স্যাটেলাইট নিয়েও ইরান সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এ ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়ার কাছ থেকে স্যাটেলাইট-সংক্রান্ত সহায়তা পাওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এসব সহযোগিতা ইরানের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং সামরিক লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণের সক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের মহাকাশবিষয়ক বিশেষজ্ঞ টড হ্যারিসন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সক্ষমতা দুর্বল করে দিতে পারে, তাহলে দেশটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি প্রশ্নের মুখে পড়বে।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এর আগে ইরানের বিরুদ্ধে মহাকাশ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের দাবি করা হয়েছে। তবে ডিআইএর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইরানের পাল্টা সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরান তাদের নেভিগেশন ও গাইডেন্স ব্যবস্থাকে ইলেকট্রনিক হামলার প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে কাজ করছে। জিপিএস সংকেত বিঘ্নিত হওয়া কিংবা যোগাযোগব্যবস্থায় ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপের মতো পরিস্থিতিতে সামরিক প্রযুক্তি সচল রাখার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে মহাকাশ প্রযুক্তি এখন কেবল যোগাযোগ বা আবহাওয়ার তথ্য সংগ্রহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষেপণাস্ত্রের দিকনির্দেশনা, সামরিক নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার ক্ষেত্রেও স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি মহাকাশ প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে।
তবে প্রায় এক ডজন কার্যকর স্যাটেলাইট থাকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা অর্জন করাই যে মহাকাশ ক্ষেত্রে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সমপর্যায়ে পৌঁছে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার সুযোগ নেই। বরং গোয়েন্দা প্রতিবেদনের মূল বার্তা হলো, সীমিত সম্পদ নিয়েও ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশনির্ভর সামরিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি, পেন্টাগনের ডিআইএ প্রতিবেদন ও অ্যাক্সিওস। 
ইরানের মহাকাশ শক্তি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান, পেন্টাগন প্রতিবেদন