শহরটা প্রতিদিন নিজের মুখ বদলায়,
কখনো বিজ্ঞাপনের পর্দায়,কখনো মানুষের ক্লান্ত কপালে।
সকাল এখানে ঘড়ির কাঁটায় আসে না-
আসে হর্নের ধারালো শব্দে,
আর ভাড়া-বাড়ার উৎকণ্ঠা বুকে নিয়ে।
তবু এই শহরের কোথাও
একজন মানুষ নিজের শেষ রুটিটুকু
অন্যের ক্ষুধার পাশে রেখে দেয়।
কেউ ব্যস্ততার ভান করে চলে যায়,
কেউ অচেনা মুখের ভাঙা দিনটা
নিঃশব্দে একটু সহজ করে দেয়।
এ শহরে মানুষকে মাপা হয়
পদবি,বেতন,পরিচয়পত্র আর প্রয়োজন দিয়ে;
তবু কিছু মানুষ আছে-
যাদের কাছে একটি হাত বাড়িয়ে দেওয়া
এখনো কোনো বিনিয়োগ নয়।
তাদের বুকের ভেতর
হিসাবের বাইরে রাখা একটি ঘর আছে,
সেখানে পুরোনো সম্পর্কেরা
নামহীন চেয়ার হয়ে বসে থাকে।
আর ভালোবাসা?
ভালোবাসা সবসময় কাছে আসার নাম নয়।
কখনো সে একই আকাশের নিচে
দুটি পৃথক জীবনের নীরব সমীকরণ-
যেখানে সমাধান জানা নেই,
তবু অঙ্কটি কেউ মুছে ফেলে না।
দুটি লাইন পাশাপাশি এগিয়ে যায়,
একটি আরেকটির দিকে ঝুঁকতে পারে না;
তবু দীর্ঘ পথ পেরিয়ে
তারা একই দূরের দিকে
নিজ নিজ ক্লান্তি বহন করে।
হয়তো এটাই শহরের সবচেয়ে গোপন সত্য-
সব সম্পর্কের দরজা খোলে না,
সব অপেক্ষারও ঠিকানা হয় না;
কিছু মানুষ শুধু থেকে যায়
জীবনের প্রান্তে একটি অসমাপ্ত বাক্যের মতো।
তবু মানুষ পরদিন বেরিয়ে পড়ে-
পকেটে সামান্য সাহস,
মুঠোয় অল্প মমতা,
আর বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা
একটি শেষ বিশ্বাস নিয়ে।
কারণ শহর যতই মানুষকে
সংখ্যা,মজুরি আর প্রয়োজনের খাতায় নামিয়ে আনুক,
মানুষের ভেতর একজন মানুষ
শেষ পর্যন্ত হিসাব মানে না।
সে ভালোবাসে-
যদিও জানে,সব ভালোবাসার গন্তব্য হয় না;
সে হাত বাড়ায়-
যদিও জানে,সব হাত ফিরে আসে না।
এই শহর তাই এখনো বেঁচে আছে-
ইট,কংক্রিট কিংবা অসংখ্য ব্যস্ত মুখে নয়;
বেঁচে আছে সেই মানুষটির কারণে,
যে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙেও
অন্য একজন ভেঙে পড়লে
নিজের শেষটুকু শক্তি তার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
হয়তো এটাই মানুষের শেষ বিদ্রোহ-
পৃথিবী তাকে পাথর বানাতে চায়,
আর সে প্রতিদিন প্রমাণ করে যায়,
তার বুকের ভেতর এখনো
একটি হৃদয়
হিসাবের বাইরে ধুকপুক করে।