মঙ্গলবার, আগস্ট ১৮, ২০২৬

রী তা রা য়

  • একাকী সে
  • ২০২৩-০৯-২৮ ২১:০৪:২২

শীতের কুয়াশা ভরা বিকেল। বিকেল পাঁচটা বাজতে না বাজতেই ঘন কুয়াশায় যেন সন্ধ্যা নেমে আসে। স্কুল থেকে উপজেলা শহর ১১কিলোমিটার। চারটা পনের এ ছুটির পরে ভ্যান নিতে প্রায় সাড়ে চারটা বেজে যায়। ভ্যানটা উপজেলার ধান হাটিতে প্রতিদিনের মতোই আজও আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেল। এখন পাঁচটা পনের মিনিট। ধান হাটি বাজারের পূর্ব পারে। সেখান থেকে প্রায় সোয়া কিলোমিটার হেটে পশ্চিম প্রান্তে গিয়ে আমার বাড়ির ভ্যান নিতে হয়।সন্ধ্যা প্রায় নেমে এলো বলে। আমাকে আরও পনের কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে।আমি খুবই চিন্তিত মনে দ্রুত বাজার পার হচ্ছিলাম। শীতের দিনে পুরনো গরম কাপরের মার্কেটে যেন মানুষের ঢল নেমেছে। প্রচন্ড ভীড় ঠেলে ঠেলে এগোচ্ছি আমি। কখন ভ্যান পাবো সেই চিন্তায় আমি অস্থির। একা একটা মেয়ে মানুষ আমি,প্রথম সন্ধ্যার মধ্যে বাড়িতে পৌঁছাতে না পারলে মা খুবই অস্থির হয়ে পড়েন। এই একটি চিন্তা প্রতিদিনের মতোই আজও আমাকে বিচলিত করে তুলেছে। তাই দ্রুত ভীড় ঠেলে এগোচ্ছি আমি। হঠাৎ আমার শাড়ির আঁচল যেন কোথায় জড়িয়ে গেলো। আমি পিছনে না ফিরেই জোরে টান দিলাম। কিন্তু না আসলো না। এবার প্রচন্ড বিরক্তিতে আরও জোরে টান দিলাম। এবং পিছনে ফিরে তাকালাম। 
আমার শাড়ির আঁচল তো আমি পেলাম। কিন্তু এই মুহুর্তে আমি যা প্রত্যক্ষ করলাম, তাতে আমার বাকযন্ত্র স্তব্ধ হয়ে গেল। আমি নির্বাক,নিশ্চল হয়ে গেলাম। শত চেষ্টা করেও আমার মুখ থেকে কোনো আওয়াজ বের করতে পারলাম না। জীবনের বহু তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার চোখের জল শুষে নিয়েছে। বাস্তবতা কি নির্মম,নিষ্ঠুর।সে শুষে নেয় জীবনের সব রং,সবখুশি,সব আলো,সব হাসি। কাঁদতে চেয়ে ও কাঁদতে না পারার যে কি যন্ত্রণা, সেটা আমি জানি। বুকটা ব্যথায় কনকনিয়ে উঠলো। শুধু অস্ফুট শব্দে বের হলো " তুই "।
আমার সামনে মুচকি হেসে পক্ষাঘাত গ্রস্থ শীর্ণ পাটকাঠির মতো বাম হাতটা অনেক কষ্টে তুলে ধরলো সে।আর ডান হাতটা সোজা পাটকাঠির মতো ঝুলে রয়েছে পাশে। অত্যান্ত শীর্ণ মুখ মন্ডলের চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। সেখানে ওর ওই মুচকি হাসিটা যেন বড়ই বেমানান। উসকো- খুসকো প্রায় জঠবাধা চুল গুলো পিঠে খোলা পরে আছে। আমার অন্তরাত্মা যেন চিৎকার করে কেঁদে বলছে, " তোকে আমায় ভিক্ষা দিতে হবে?"
ওর চোখে আজ কোন জল নেই। হয়তো তার নিষ্ঠুর নিয়তি তার চোখের অশ্রু ও শুষে নিয়েছে। একদিকে সেটা ঠিকই হয়েছে। যার চোখের জল মোছার মতো সাধ্য নেই, তার কি আর অশ্রু ঝরলে চলে?তাই তার ভাগ্য বিধাতা এক নিদারুণ, নিষ্ঠুর খরা এনে দিয়েছে তার চোখে। ঠিক যেন রবিঠাকুরের জৈষ্ঠ্যের খর রৌদ্র। আমি নির্বাক,শুধু নিঃশব্দে  বসলাম তার সামনে। আমার মনে পরল বড়ই ছিচকাদুনে আর মুখরা ছিল সে। কিন্তু আজ তার স্রষ্টা তার থেকে দুটোই কেড়ে নিয়েছেন। তাই আজ সে বাকহীন, অশ্রুহীন। আছে শুধু সেই চিরচেনা মুচকি হাসি। আমি তার সামনে একটা একশো টাকার নোট  বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু না সে তার টাকাটা নেওয়ার মতোও ক্ষমতা নেই। তাই এবার আমি টাকাটা তার হাতেই দিলাম। টাকাটা দেখে সে মাথা নাড়াল আর সেটা মাটিতে ফেলে দিলো। বুঝলাম সবকিছু হারালেও সে তার নৈতিকতা ভুলে যায়নি। এবার আমি একটা দশ টাকার নোট দিলাম। মুচকি হেসে সে এটা নিলো। মনে মনে বললাম, হা ঈশ্বর, তুমি তাকে কেন এভাবে বাঁচিয়ে রাখলে?  তোমার কাছে কেন ডেকে নিলেনা? তুমি কেন এমন পাষাণ, নিষ্ঠুর!  কেন তুমি এমন করলে? 
সে রাতে আমি আর খেতে পারলাম না। ঘুমাতে পারলাম না। শুধু বিছানায় শুয়ে  সারারাত এপাশ - ওপাশ করলাম। আমার হাজার হাজার মধুর  স্মৃতির মধ্যে একটা মাত্র তিক্ত স্মৃতি যেন এক ঘড়া দুধের মধ্যে এক ফোটা টকের মতো। সব নষ্ট করে দিল। একবার আমার ঘরের উত্তরের জানালাটা খুলে দিলাম। দেখলাম সবাই কি সুন্দর ঘুমাচ্ছে!  হায় ঈশ্বর!  ধিক এ জগতের মধুর সম্পর্ক গুলোকে।মানুষ এতটা বেঈমান আর স্বার্থপর হতে পারে?  আজ প্রিয় পড়শীর শান্তির ঘুমকে আমি অন্তরের অন্তস্থল থেকে ধিক্কার জানালাম। জানালাম অন্তরের ঘৃণা। আমি সারারাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিলাম।আজ এই শীতের রাতের উত্তরের খোলা জানালার হিমেল হাওয়া ও যেন আমার হৃদয়কে শান্ত করতে পারল না।শুধু ভাবলাম, পারুলরা কি শুধু  বিধাতার নিষ্ঠুরতম খেলার সামগ্রী হতেই এই পৃথিবীর বুকে আসে? 
পরদিন ভোর হতেই আমি পারুলের বাড়িতে গেলাম। ওর বাবা মারা গেছেন আজ দুই বছর হয়ে গেল। বড় ভাই কাজের চাপে রাতে বাড়ি ফেরেননি। শুধু ভাবি আর ছোট ছোট বাচ্চা দুটো বাড়িতে রয়েছে। পারুলের নামটি শুনতেই যেন তেলে - বেগুনে জ্বলে উঠলেন তিনি। বললেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।ওটা ওদের ব্যাপার।আমি কিছুই জানিনা।
আমি শুধু বললাম, আপনাদের বিয়েটা কিভাবে হয়েছে আমার সব মনে আছে ভাবি। আর যার কথা শুনতেই চাচ্ছেন না, আপনার বিয়েতে তার ভূমিকা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেটাও আমার অজানা নয়।কিন্তু আমি ভাবছি, আপনি কিভাবে এটা ভুলে যেতে পারেন? আচ্ছা, ভাই কোথায়?  কিন্তু তিনি কোন উত্তর দিলেন না, সেখান থেকে চলে গেলেন। সেদিন সন্ধ্যায় আমি আমার  জেলা বদলির চিঠি পেলাম। তার থেকে চলে এলাম অনেক দুরে। 
পারুল শুধু একটি নিছক নাম নয়। একটি জীবন্ত মহাকাব্য, মহাট্রাজেডি।জন্মের সময় মারা যায় তার মা। বাবার সংসারে বড়ভাই আলালের সাথে বড় হয় সে। কিন্তু সে দুলালি নয়।কারণ মাত্র তিন - চার বছর বয়স থেকেই তার সখ্যতা গড়ে উঠে রান্নাঘরের সাথে। আর বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে বাইরের পরিবেশ থেকে। স্কুল, বিদ্যালয়,বই,কলম এসব কি জিনিস?  এসবের সাথে তার কোন পরিচয় ছিলনা। তবে এ নিয়ে তার মনে কোন ক্ষোভ ছিল না। কারণ সে মাতৃহীন। অভাবের সংসারে বাবা সারাদিন ব্যস্ত থাকতেন।তাই  জীবনে দু,এক দিনের বেশি  স্কুলে যাওয়া হয়নি।কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যা না থাকলেও, বাইরের পরিবেশের সাথে তার কোন বিবাদ ছিল না। ছিলনা কোন মাথা ব্যাথা।
আমি স্কুলে যাই, লেখাপড়া করি।এ নিয়ে তাকে কোনদিন কোন কথা বলতে শুনিনি। কোনদিন দুঃখও করতে দেখিনি। ওর যত কথা, যত গল্প সব ওর সংসারকে ঘিরে। বাবা কি খেতে পছন্দ করে, ভাই কি খেতে পছন্দ করে এইসব তার মাথা ব্যাথার বিষয়। বাড়িতে মেহমান এলে, তার কি করণীয়, সেটা সে ঠিকই জানে।পাড়া - প্রতিবেশিরা কে কেমন, সবই তার জানা।
কার সাথে কেমন আচরণ করলে সম্পর্ক ভালো থাকবে, সেটা সে ঠিকই জানে। আর তার এসব গল্প শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত হয়ে যেতাম। কিন্তু তাতে তার কোন ভ্রক্ষেপ নেই।একবার কথ বলা শুরু করলে আর থামার কোন নাম নিতো না। মাঝে মাঝে আমার এতে লেখাপড়ার ক্ষতি হতো। কিন্তু ও একই রকম। কোন বদল নেই। আমি ওর গল্প শুনতে না চাইলে, সে আমার হাতে তার কনুই দিয়ে খোঁচা দিত,বলতো" শোনা না জয়িতা, বলেই আবার তার রাজ্যের গল্প শুরু করতো।" বিকেলে এলে রাত করে দিতো বকবকানিতে।আর ওর হাসি!  ওরে বাপরে, আমি তার সামনে হাসির কথা খুব একটা বলতাম না।কারণ, ওর হাসি মানেই, মাটিতে লুটিয়ে পরা।একবার হি হি হি হি শুরু হলেই বিপদ। যত পারিস তার থেকে দুরে পালা।নইলে নিজে তো মাটিতে লুটিয়ে পরবেই তার সাথে তোমাকে ও সে টেনে মাটিতে লুটিয়ে পরতে বাধ্য করবে। মাঝে মাঝে আমি ভেবেই পাই না; তার উপরে কি করবো? রাগ? না শুধুই তার সাথে হেসেই যাবো? তবে আমি তাকে বাঁধা দিতাম না।  কারণ ওর মধ্যে একটা অদ্ভুত সরলতা ছিল। যেটা আমাকে মুগ্ধ করতো। ওর চোখ দুটো ছিল টানা টানা,  বড় বড়,এবং অদ্ভুত মায়াভরা। 
পারুল মুসলিম আর আমি হিন্দু। তবু প্রতিদিন যাতায়াত ছিল আমাদের। সেই আসতো আমার কাছে। তবে শুধু সেই নয়,পাড়ার যত মেয়ে ছিল, শুধু আমার সম বয়সীই নয়, ছোট থেকে বড়, সবাই আসতো আমার কাছে নানা প্রয়োজনে।আমি আমার সাধ্যমতো তাদেরকে সাহায্য - সহযোগিতা করেছি।আমার নতুন সেলাই করা থ্রি পিচ পরেছিলো সুলতানা ও আমিনা। গিয়েছিল মেহমান বাড়িতে। আর রুবিয়া আসতো বইপড়া শিখিয়ে নিতে।আমিনা আমার নতুন জামাটাতে দাগ লাগিয়েছলো। আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গিয়েছিল, তবু তাকে কিছু বলিনি। সেই দাগ তুলতে গিয়ে আমার জামাটা আরও বেশি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আমি আমিনাকে কিছু বলিনি, কারণ ওরা খুবই গরিব ছিল। একবার সে তার ব্যবহার করা নাকফুল আমার কাছে বিক্রি করতে এসেছিল, খাবার নেই বলে। আমি তার নাকফুল নেইনি,এমনি দু,কেজি চাল দিয়েছিলাম মাকে লুকিয়ে। সে পরে আর শোধ করেছিল কিনা মনে পরছেনা।তেমনি নানা প্রয়োজনে আসতো জনতা,আরতি, মুক্তি,অনিলা।মুক্তি ও আমার অনেক জামা- কাপড় নষ্ট করেছিল। আমার মা সবাইকে বেটি বলতো।যেমন বলতো মুক্তি বেটি,তেমনি বলতো পারুল বেটি।আজ সবাই নিজের নিজের  সংসার সামলাচ্ছে।আর এই পৃথিবীর মহা সংসারে একাকী, এক কোণে  পড়ে আছে পারুল একা, নিঃসঙ্গ। 
একদিন সব ছিল পারুলের। ঘর,সংসার,স্বামী, পুত্র, পরিজন, আত্মীয় - স্বজন সবই।লক্ষ্মী ছিল সে। কিন্তু আজন্মকাল যার নিয়তি দুঃখের সাথে সন্ধি করে।তার ভাগ্যে সুখ পাখি শুধুই মরিচিকার মতো।সাগরের চোরা বালিতে, সাগরের অতলে তলিয়ে গেল  তার ভাগ্যের সূর্য। এক নিকষ অন্ধকার এসে গ্রাস করলো তাকে।
প্রায় আট বছর হলো পারুলের বিয়ে হয়েছে। দুই পুত্র সন্তান, স্বামী, সংসার নিয়ে ভালোই ছিল পারুল।গরিব হলেও সংসারে ছিল শান্তি, ভালোবাসা। বিয়ের পরে তার বরকে নিয়ে কয়েকবার বেড়াতে ও এসেছিলো আমাদের বাড়িতে সে।বলেছিল, " এমন স্বামী নাকি ভাগ্য করেই পাওয়া যায়"।আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট ছাত্রী।সেসব কিছুই বুঝতাম না।যাই হোক সে তার সংসার নিয়ে খুশি, এটাই বড়ো কথা। তবে পারুলের বিয়ের আগে বিয়ে হয়েছে তার বড় ভাই আলালের। একদিন হঠাৎই কাউকে কিছু না বলে বউ নিয়ে বাড়িতে হাজির হয় আলাল।ব্যাস,বাড়িতে শুরু হলো অশান্তি। বাবা কিছুতেই একমাত্র ছেলের এমন বিয়ে মানবেন না।ছেলে- বউকে কিছুতেই বাড়িতে ঠাঁই দিতে চাননা তিনি।পারুল বলেছিল, সেও তিনদিন কিছুই খায়নি।বড়ভাই আর ভাবীর পক্ষ নিয়ে বাবার বিরুদ্ধে লড়েছিল খুব। সে কন্যা অন্তপ্রাণ মোসলেমউদ্দিন ছেলে - বউমাকে ঘরে ঠাঁই দেন।তবে তিনি কোনদিন ওদের থেকে কিছু নেননি, কোনদিন রান্না পর্যন্ত খাননি একমাত্র ছেলের বউয়ের।অভিমান সত্যিই বড়ই অদ্ভুত। যার জন্য একসময় রাত জেগে কাটিয়েছেন তিনি।আজ অভিমান তার থেকেই অনেক দুরে সরিয়ে নিয়ে গেছে। 
পারুলের ২য় সন্তান জন্মের সময় খুবই কষ্ট হয়।এরপর শারীরিকভাবে সে দুর্বল হতে থাকে। সন্তান প্রসবের ঘাটতি এবং পুষ্টিকর খাবারের অভাবে  সে ধীরে ধীরে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। এক বছরের ছেলেকে নিয়ে আসে বাবার কাছে চিকিৎসার জন্য। কিছুদিনের চিকিৎসায় কিছুটা সুস্থ হয় সে।ফিরে যায় আপন সংসারে। কিন্তু নিষ্ঠুর নিয়তির কাছে সেই সুখ সইলো না।মাস ছয়েক পরে তাকে আবারও ফেরত পাঠানো হয় বাবার বাড়িতে। কারণ তার বাম পা আর ডান হাত পরে গিয়ে একেবারে অচল হয়ে যায়। পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয় সে।

 


এ জাতীয় আরো খবর