লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে প্রায় এক বছর ধরে আটকে থাকা বাবাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার এবং চক্রের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মুন্না নামের এক তরুণ। ৭ অক্টোবর বুধবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ও তার পরিবার এই আকুতি জানান। একইসঙ্গে লিবিয়ায় আটকে থাকা অন্য বাংলাদেশিদের উদ্ধার এবং এই চক্রের মাধ্যমে অতীতে সংঘটিত হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ভিকটিম নুরুল ইসলামের স্ত্রী মাকসুদা, ছেলে মুন্না, ভাগ্নে জাহিদ ও বন্ধু রাজু।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মুন্না জানান, তার ছোট বোন ক্যান্সারে আক্রান্ত। একদিকে বোনের ব্যয়বহুল চিকিৎসা এবং অন্যদিকে বাবাকে বাঁচানোর লড়াই—এই দুই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয় যে, পূর্বপরিচিত শিপন খানের প্ররোচনায় বাবাকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ইতালি পাঠানোর চুক্তি করা হয়। প্রথম দফায় ৬ লাখ টাকা ও পাসপোর্ট দেওয়ার পর ব্যাংকের মাধ্যমে আরও ১৪ লাখ টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু ইতালিতে না পাঠিয়ে বাবাকে লিবিয়ায় নিয়ে একটি ঘরে আটকে রাখা হয়।
পরবর্তীতে মুক্তিপণ ও বিভিন্ন অজুহাতে দফায় দফায় আরও ১২ লাখ এবং ৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি বোনের চিকিৎসার জন্য জমানো জমানো টাকাও দালাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন তারা। একপর্যায়ে গ্রাম্য শালিসের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করলে দালালরা বাবাকে এক সশস্ত্র বাহিনীর কাছে তুলে দেয় এবং তিনি ‘পালিয়ে গেছেন’ বলে মিথ্যা নাটক সাজায়।
পরিবারের পক্ষ থেকে বাধ্য হয়ে মাদারীপুর আদালতের মানবপাচার ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা (পিটিশন নং-৩৪৯/২০২৬, মাদারীপুর সদর থানা, মামলা নং-২২, বাৎসরিক নং-৭৪০) দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে খিলগাঁও থানা ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) এসআই সালমানের সহযোগিতায় বনশ্রী থেকে চক্রের দুই সদস্যকে আটক করা হয়।
তবে আসামিরা গ্রেপ্তারের পর থেকেই মুন্নার পরিবারকে মামলা তুলে নিতে এবং আপস করার জন্য ব্যাপক চাপ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি প্রাণনাশের ও মিথ্যা মামলার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মুন্না অভিযোগ করেন, এই চক্রের হাতে শুধু তার বাবাই নন, লিবিয়ায় এখনও ৪০ জনের বেশি বাংলাদেশি নাগরিক জিম্মি রয়েছে। ইতিপূর্বে মুন্না তালুকদার, ইমরান ও বায়েজিদ শেখসহ বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিককে লিবিয়ায় গুলি করে হত্যা করা হলেও সেগুলোকে ‘সাগরপথে দুর্ঘটনা’ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে যমুনা টেলিভিশনেও এ বিষয়ে সংবাদ প্রচারিত হয়েছিল।
তদন্তের স্বার্থে মানবপাচার চক্রের মূল হোতা ও সহযোগীদের কয়েকজনের নাম প্রকাশ করে সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়েছে: অমিত হাসান কবির, লিটু মুন্সী, শিপন খান, আনিকা খান, তানিয়া মুন্সী, মোমিন, জাহিদ, রোজি।
সংবাদ সম্মেলন থেকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ প্রশাসন) নিম্নোক্ত দাবিগুলো জানানো হয়- (১) লিবিয়া থেকে দ্রুত জীবিত ও নিরাপদে বাবাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। (২) শুধু দুজনকে গ্রেপ্তার নয়, দেশ ও বিদেশে থাকা চক্রের প্রতিটি সদস্যকে আইনের আওতায় আনতে হবে। (৩) লিবিয়ায় নিহত অন্যান্য বাংলাদেশিদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও বিচার করতে হবে। (৪) মানবপাচার, জিম্মি করা, মুক্তিপণ আদায় এবং হত্যার হুমকির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। (৫) প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থ ব্যাংক লেনদেন ও প্রমাণের ভিত্তিতে উদ্ধার করে ফেরত দিতে হবে। (৬) ভুক্তভোগী পরিবার ও সাক্ষীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলন শেষ পর্যায়ে মুন্না বলেন, আমি প্রতিশোধ চাই না, আমি শুধু আমার বাবাকে জীবিত ফিরে পেতে চাই। কোনো টাকা দিয়ে নয়, কোনো আপস করে নয়—রাষ্ট্রের সহযোগিতায় আমার বাবাকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিন।
এই মানববন্ধনে সংহতি জানিয়েছেন বাংলাদেশ সিভিল রাইটস্ সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক শেখ মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, অবিলম্বে মানবপাচারকারীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবি জানিয়েছেন।