বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০২৬

ফুটপাত ফিরতেই বদলে গেল মিরপুর-১০,হাঁটার অধিকার ফিরে পেল নগরবাসী

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-১০-০৭ ১৩:৩১:৩৩
ছবি: সংগৃহীত।

ফুটপাত যখন দখলমুক্ত হয়,তখন শুধু একটি হাঁটার পথই ফিরে আসে না-একটি এলাকার পুরো নগরজীবনের চিত্রও বদলে যেতে পারে। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক উচ্ছেদ অভিযানের পর সেই পরিবর্তনেরই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে দোকানপাট,অস্থায়ী বাজার ও মানুষের ভিড়ে সংকুচিত হয়ে থাকা ফুটপাত এখন অনেকটাই উন্মুক্ত। পথচারীরা সড়কে নেমে না গিয়ে ফুটপাত দিয়েই চলাচল করতে পারছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, শিশু, নারী, প্রবীণ ও কর্মজীবী মানুষের জন্য তৈরি হয়েছে তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক পরিবেশ।
একসময় মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে হোপ স্কুল রোড পর্যন্ত ফুটপাতের বড় অংশ কার্যত পথচারীদের ব্যবহারের বাইরে চলে গিয়েছিল। বিভিন্ন ধরনের অস্থায়ী দোকান বসায় শুধু হাঁটার জায়গাই কমেনি, সড়কের ওপরও বাড়ছিল মানুষের চাপ। ফলে একই জায়গায় পথচারী, দোকানদার ও যানবাহনের সংঘাত তৈরি হয়ে নিয়মিত দুর্ভোগের সৃষ্টি হতো।
বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছিল। স্কুলে যাওয়া-আসার সময় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বড় অংশ ফুটপাত ব্যবহার করতে না পেরে সড়কের ওপর দিয়ে চলাচল করতেন। এতে একদিকে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ত,অন্যদিকে যান চলাচলও ব্যাহত হতো।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অভিযানের পর পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। দখলমুক্ত করা অংশ পরিষ্কার করা হচ্ছে। ফুটওভার ব্রিজের নিচের জায়গাতেও গাছ লাগিয়ে পথচারীবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে আগে যেখানে দোকান ও জটলা ছিল, সেখানে এখন খোলা জায়গা ও চলাচলের পরিসর তৈরি হয়েছে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে সড়ক ব্যবস্থাপনাতেও। ফুটপাত ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় পথচারীদের সড়কে নামার প্রয়োজন কমেছে। স্বাভাবিকভাবেই যানবাহনের চলাচলের জায়গা বেড়েছে। ফলে যানজট কমার পাশাপাশি পথচারী ও যানবাহনের মধ্যে সংঘাতও কিছুটা কমেছে।
নগর বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের বক্তব্যও হলো-ফুটপাত কোনো ব্যবসায়িক স্থাপনার জায়গা নয়,এটি নগরবাসীর হাঁটার অবকাঠামো। একটি শহরের সড়কব্যবস্থা তখনই কার্যকর হয়,যখন গাড়ির পাশাপাশি পথচারীর চলাচলের অধিকারও নিশ্চিত থাকে।
মিরপুর-১০-এর সাম্প্রতিক পরিবর্তন সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। ফুটপাত উন্মুক্ত হওয়ার পর মানুষের সময় বাঁচছে, শিক্ষার্থীরা সহজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিবহনে পৌঁছাতে পারছেন, অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটতে পারছেন। একই সঙ্গে স্থায়ী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামনেও ক্রেতাদের চলাচল স্বাভাবিক হয়েছে।
তবে উচ্ছেদ করাই সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান নয়। নগরবাসীর অভিজ্ঞতা বলছে, নিয়মিত নজরদারি না থাকলে দখলমুক্ত ফুটপাত আবারও অস্থায়ী স্থাপনায় ভরে যেতে পারে। তাই অভিযানের পাশাপাশি দখল প্রতিরোধে স্থায়ী ব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি এবং জীবিকার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জন্য পরিকল্পিত বিকল্প ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
হকারদের জীবিকার বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মানুষের হাঁটার জায়গা দখল করে ব্যবসা করার সুযোগ না দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার ব্যবস্থা করা গেলে একই সঙ্গে পথচারীর অধিকার ও জীবিকার বিষয়টি সমন্বয় করা সম্ভব।
মিরপুর-১০ এখন তাই শুধু একটি উচ্ছেদ অভিযানের উদাহরণ নয়; এটি দেখিয়ে দিচ্ছে, নগর পরিকল্পনায় সামান্য একটি পরিবর্তনও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কত বড় স্বস্তি আনতে পারে।
একটি শিশুর হাত ধরে বাবা-মায়ের হাঁটা, একজন শিক্ষার্থীর নিরাপদে গণপরিবহনে পৌঁছানো কিংবা একজন প্রবীণের নিশ্চিন্তে কয়েক মিনিট পথ চলা-এসব কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এগুলো একটি বাসযোগ্য শহরের মৌলিক অধিকার।
মিরপুর-১০-এর ফুটপাত যদি দখলমুক্ত রাখার এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকে,তবে এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে একটাই-'ফুটপাত আবার ফুটপাত হিসেবেই থাকবে,আর শহরের পথ আবার মানুষের জন্য খুলে যাবে।'

ফুটপাত,পথচারী,নগরব্যবস্থা


এ জাতীয় আরো খবর