২০২৪ সালে একই ওয়ার্ডে বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়েছিল হাজারও অধিক মানুষ, ফের ঝুঁকিতে জেটি-সংলগ্ন জনপদ!
মহেশখালী (কক্সবাজার)
সমুদ্রঘেরা দ্বীপ মহেশখালী, জোয়ার-ভাটা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অতিবৃষ্টির সঙ্গে এখানকার মানুষের বসবাস দীর্ঘদিনের। এই জনপদের মানুষের ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জীবন-জীবিকা রক্ষায় বেড়িবাঁধের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সুরক্ষা বাঁধের কোনো কোনো অংশ যখন অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে বড় প্রশ্ন দুর্যোগ আঘাত হানার আগে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর শুরু হবে সংস্কারের তোড়জোড়?
মহেশখালী পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জেটি-সংলগ্ন এলাকায় বর্তমানে এমনই একটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির কথা জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি,জেটি এলাকার গুরুত্বপূর্ণ বেড়িবাঁধের কিছু অংশপ্রয়োজনীয় সংরক্ষণ ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই রয়েছে।
ফলে বড় জোয়ার, অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় কিংবা জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে আশপাশের জনবসতিতে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অতীতের ঘটনা কি সতর্কবার্তা নয়? এ আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের ২৬মে ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে মহেশখালীপৌরসভার
০৮ নম্বর ওয়ার্ডের সিকদারপাড়া এলাকায় বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছিল। সে সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রায় ৩ হাজার মানুষ পানিবন্দি হওয়ার তথ্য উঠে আসে। একই সঙ্গে মূল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বেশ কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ার কথাও জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ কয়েক বছর আগের সেই ঘটনা শুধু অতীতের একটি দুর্যোগের স্মৃতি নয়; বর্তমান ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও হতে পারে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, অতীতে যে এলাকায় বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছিল, সেই এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো কি নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে? বাঁধের কোথায় দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, কোথায় মাটি সরে গেছে বা কোথায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রয়োজন এসব বিষয়ে নিয়মিত কারিগরি পরিদর্শন হচ্ছে কি না, সেটিও জনস্বার্থে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
জেটি এলাকার গুরুত্ব আলাদা,মহেশখালী জেটি শুধু স্থানীয় যাতায়াতের একটি ঘাট নয়; এটি দ্বীপবাসীর যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ।জেলা প্রশাসনের পর্যটন তথ্যেও মহেশখালী জেটিকে গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় ও যোগাযোগস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী জেটিটি ৬৯৫ মিটার দীর্ঘ ও ৬ মিটার প্রশস্ত এবং ১৯৮৯ সালে নির্মিত হয়।ফলে জেটি-সংলগ্ন বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব শুধু আশপাশের কয়েকটি বসতিতে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। যোগাযোগব্যবস্থা, ব্যবসা-
বাণিজ্য, যাত্রী চলাচল এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বাঁধ রক্ষায় নথিতেও গুরুত্ব, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নথিপত্রে কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ ভাঙন ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে জরুরি ও অস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজের তথ্য রয়েছে।
মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকার পোল্ডার-সংক্রান্ত নথিতে সমুদ্র উপকূলীয় তীরভাঙনের কারণে বাঁধ মেরামতের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পতালিকায় মহেশখালী ও কক্সবাজারের পানি নিয়ন্ত্রণ,নিষ্কাশন ও তীর সংরক্ষণসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্পের তথ্য রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগঃ
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশে স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় তারা সবসময় শঙ্কায় থাকেন। বিশেষ করে দুর্যোগের সময় জোয়ারের পানি বেড়ে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। তাদের ভাষ্য, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করার চেয়ে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো চিহ্নিতকরে শক্তিশালী করা বেশি কার্যকর।
তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তারা দ্রুত সরেজমিন পরিদর্শন, ঝুঁকি নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজের দাবি জানিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠছে রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও,একটি উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণের পর সেটি রক্ষণাবেক্ষণ না করলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাটি সরে যাওয়া, ঢালের ক্ষয়,জোয়ারের চাপ, ঢেউয়ের আঘাত এবং অতিবৃষ্টির কারণে দুর্বলতা তৈরি হতে পারে। তাই বাঁধ সংরক্ষণকে এককালীন সংস্কারের পরিবর্তে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও নজর দারির আওতায় রাখা প্রয়োজন।
এখানেই উঠছে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন জেটি-সংলগ্ন বাঁধের বর্তমান ঝুঁকিপূর্ণ অংশ কত মিটার? সর্বশেষ কবে বাঁধটি কারিগরি পরিদর্শন করা হয়েছে?সর্বশেষ কবে সংস্কার বা প্রতিরক্ষা কাজ হয়েছে?বর্তমান ঝুঁকি নিরূপণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো প্রতিবেদন রয়েছে কি না? কোনো প্রকল্পের আওতায় এ অংশের সংস্কার বা সংরক্ষণের প্রস্তাব রয়েছে কি না?
দুর্যোগের পর নয়,আগেই ব্যবস্থা,উপকূলীয় এলাকায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঝুঁকি কমানো। বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর মানুষের ঘরবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সম্পদ রক্ষায় জরুরি তৎপরতা চালানোর চেয়ে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ
অংশ শক্তিশালী করা তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে। মহেশখালীর ০৮ নম্বর ওয়ার্ডের অতীত অভিজ্ঞতাও বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৪ সালে সিকদারপাড়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের জন্য একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। তাই একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এখন থেকেই ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয়দের দাবি,এলাকাবাসীর পক্ষথেকে জেটি-সংলগ্ন বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ অংশ জরুরি ভিত্তিতে সরেজমিন পরিদর্শন করে বাঁধের দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশ চিহ্নিত করা; প্রয়োজনীয় মাটি ভরাট ও ঢাল সংরক্ষণ করা;
জোয়ারের পানির চাপ মোকাবিলায় উপযুক্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া; প্রয়োজন হলে স্থায়ী বাঁধ সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া; নিয়মিত নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিতকরা এবং দুর্যোগের আগে জরুরি প্রস্তুতি গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের জবাবই এখন গুরুত্বপূর্ণ, এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষ করে বাঁধটির মালিকানা/রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কোন সংস্থার, বর্তমান ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো লিখিত প্রতিবেদন আছে কি না এবং সংস্কারের জন্য কোনো বরাদ্দ বা প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে কি না তা জানা সম্ভব হয়নি বক্তব্য না পাওয়ার করণে।
উপকূলের বেড়িবাঁধ কেবল মাটি ও বালুর একটি স্থাপনা নয়; এটি একটি জনপদের প্রথম সারির সুরক্ষা ব্যবস্থা। সেই সুরক্ষা ব্যবস্থায় দুর্বলতা থাকলে তার মূল্য দিতে হতে পারে সাধারণ মানুষকেই। মহেশখালীর জেটি-সংলগ্ন ০৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, দুর্যোগের অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।