মহেশখালী (কক্সবাজার)
কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর গুরুত্বপূর্ণ গোরকঘাটা নদীবন্দরে যাত্রী পারাপারের ট্যারিফ আদায়কে কেন্দ্র করে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ট্যারিফ তফসিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগগত শর্ত বাদ দিয়ে ইজারাদারের পক্ষ থেকে প্রচারিত বিজ্ঞপ্তিতে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য ট্যারিফের কথা উল্লেখ করা হয়। এতে নদীবন্দর ব্যবহারকারী সাধারণ যাত্রী ও পর্যটকদের মধ্যে ট্যারিফের প্রকৃত প্রয়োগ নিয়ে বিভ্রান্তির আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে আসার পর সংশ্লিষ্ট ইজারাদারকে বিজ্ঞপ্তিটি অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রশাসনের নির্দেশের পর বিজ্ঞপ্তিটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্যসম্বলিত বিজ্ঞপ্তি প্রচার না করার বিষয়ে ইজারাদারের কাছ থেকে লিখিত মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ঘটনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের টিএ শাখার স্মারক নং–১৫৫-এর মাধ্যমে নির্ধারিত ট্যারিফ তফসিলের ৩.০৩ উপধারা। ওই উপধারায় পর্যটকবাহী নৌযান/জাহাজে আরোহনকারী যাত্রীদের ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য পৃথক ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
ট্যারিফের শর্ত কোথায়?
সংশ্লিষ্ট ট্যারিফ বিধানের বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু যাত্রী দেশি না বিদেশি পর্যটক—এ পরিচয়ই ট্যারিফ নির্ধারণের একমাত্র বিষয় নয়। বরং তিনি পর্যটকবাহী নৌযান বা জাহাজে আরোহনকারী যাত্রী কি না, সেটিও ওই উপধারার প্রয়োগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
অর্থাৎ, ৩.০৩ উপধারার বিধানকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। দেশি ও বিদেশি পর্যটকের জন্য নির্ধারিত ট্যারিফের পাশাপাশি ‘পর্যটকবাহী নৌযান/জাহাজে আরোহনকারী যাত্রী’এই শর্তটিও বিধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কিন্তু গোরকঘাটা নদীবন্দরের ইজারাদারের পক্ষ থেকে প্রচারিত বিজ্ঞপ্তিতে এই গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি বাদ পড়ে যায়। সেখানে মূল ট্যারিফ তফসিলের নির্দিষ্ট প্রয়োগক্ষেত্র স্পষ্ট না করে কেবল দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত ট্যারিফের কথা তুলে ধরা হয়।
ফলে বিজ্ঞপ্তিটি পাঠ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল যে, গোরকঘাটা নদীবন্দর দিয়ে যাতায়াতকারী সব দেশি ও বিদেশি পর্যটকের ক্ষেত্রেই ওই পর্যটক ট্যারিফ প্রযোজ্য।
আংশিক বিধান, পূর্ণাঙ্গ অর্থের বিভ্রান্তি
প্রশাসনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো সরকারি ট্যারিফ বা বিধানের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট শর্ত থাকলে সেটি বাদ দিয়ে শুধু হার বা অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করা হলে বিধানটির প্রকৃত প্রয়োগক্ষেত্র পরিবর্তিতভাবে উপস্থাপিত হতে পারে।
এখানেও মূল ট্যারিফ তফসিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত বাদ পড়ায় বিজ্ঞপ্তিটি মূল বিধানের পূর্ণাঙ্গ প্রতিফলন ছিল না বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি সাধারণ যাত্রীদের জন্য বিশেষভাবে বিভ্রান্তিকর হতে পারে। কারণ একজন যাত্রী নিজেকে পর্যটক হিসেবে বিবেচনা করলেই সংশ্লিষ্ট পর্যটক ট্যারিফ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে কি না তা নির্ভর করবে মূল ট্যারিফ তফসিলে নির্ধারিত প্রয়োগের শর্ত পূরণ হচ্ছে কি না তার ওপর।
ফলে ট্যারিফ আদায়ের ক্ষেত্রে ইজারাদার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাখ্যার পরিবর্তে অনুমোদিত ট্যারিফ তফসিলের পূর্ণাঙ্গ বিধান অনুসরণ করাই প্রত্যাশিত।
প্রশাসনের নজরে আসার পর বিজ্ঞপ্তি অপসারণ
বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ইজারাদারকে বিজ্ঞপ্তিটি অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
প্রশাসনের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিজ্ঞপ্তিটি সরিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আইন, বিধি ও প্রযোজ্য ট্যারিফ তফসিলের পূর্ণাঙ্গ শর্ত অনুসরণ না করে কোনো বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্যসম্বলিত বিজ্ঞপ্তি প্রচার না করার বিষয়ে ইজারাদারের কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের এ পদক্ষেপকে স্থানীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ নদীবন্দরের মতো জনসাধারণের সরাসরি ব্যবহারযোগ্য স্থানে যাত্রীদের কাছ থেকে আদায়যোগ্য অর্থের হার ও প্রযোজ্য শর্ত স্পষ্ট থাকা জরুরি।
এমপি ফরিদের নির্দেশনা
এদিকে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ-এর পক্ষ থেকেও গোরকঘাটা নদীবন্দরে প্রচলিত আইন, বিধি ও প্রযোজ্য ট্যারিফ তফসিল যথাযথভাবে অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্ধারিত ট্যারিফের বাইরে কোনো অর্থ আদায় করা যাবে না এবং ট্যারিফ তফসিলের শর্তাবলি যথাযথভাবে অনুসরণ করেই আদায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, মহেশখালীর সঙ্গে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার নৌযোগাযোগে গোরকঘাটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এখানকার ট্যারিফ আদায়ের ক্ষেত্রে সামান্য অস্পষ্টতাও বিপুলসংখ্যক যাত্রী ও নৌযান ব্যবহারকারীর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।
বিআইডব্লিউটিএকে অবহিত
গোরকঘাটা নদীবন্দরে ট্যারিফ আদায়ের ক্ষেত্রে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত ট্যারিফ তফসিলের সংশ্লিষ্ট ধারা ও শর্তাবলি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএকেও বিষয়টি অবহিত করেছে উপজেলা প্রশাসন।
কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া থেকে মহেশখালীর গোরকঘাটা নৌপথে বিআইডব্লিউটিএর নৌযান/সী-ট্রাক চলাচলের তথ্যও সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্যে পাওয়া যায়।
ফলে গোরকঘাটা নদীবন্দরের ট্যারিফ ব্যবস্থাপনায় শুধু ইজারাদারের কার্যক্রম নয়, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের তদারকিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
যে বিষয়গুলো এখন নজরদারির দাবি রাখে
ঘটনাটি সামনে আসার পর কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে
প্রথমত, মূল ট্যারিফ তফসিলের পূর্ণাঙ্গ শর্ত অনুসরণ করে যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে কি না।
দ্বিতীয়ত, নদীবন্দরে দৃশ্যমান স্থানে অনুমোদিত ট্যারিফ তফসিলের পূর্ণাঙ্গ ও হালনাগাদ কপি প্রদর্শন করা হয়েছে কি না।
তৃতীয়ত, ইজারাদারের কর্মীরা ট্যারিফের প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে সঠিকভাবে অবহিত কি না।
চতুর্থত, দেশি ও বিদেশি পর্যটকের জন্য নির্ধারিত ট্যারিফ কোন পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য-তা যাত্রীদের কাছে স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে কি না।
পঞ্চমত, নির্ধারিত ট্যারিফের বাইরে অতিরিক্ত কোনো অর্থ আদায় হচ্ছে কি না-তা নিয়মিতভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএর সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহারেই কি শেষ, নাকি স্থায়ী সমাধান?
প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিতর্কিত বিজ্ঞপ্তি অপসারণ এবং ইজারাদারের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হলেও বিষয়টির স্থায়ী সমাধানের জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তাদের দাবি, গোরকঘাটা নদীবন্দরে যাত্রীদের চোখে পড়ার মতো স্থানে অনুমোদিত ট্যারিফের পূর্ণাঙ্গ ধারা, প্রয়োগের শর্ত এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্র স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার সময় নির্ধারিত রসিদ দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এতে ইজারাদার ও যাত্রী উভয় পক্ষের জন্যই স্বচ্ছতা বজায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে ট্যারিফ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ কমবে।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে গোরকঘাটা নদীবন্দর
দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাতে ট্যারিফ কাঠামো দীর্ঘদিন পর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের নতুন বিআইডব্লিউটিএ ট্যারিফ কাঠামোতে নৌযান, বন্দর, টার্মিনাল, কার্গো হ্যান্ডলিং, বার্জিং, মুরিংসহ বিভিন্ন সেবার চার্জ পরিবর্তনের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
এই বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় নদীবন্দরগুলোতে অনুমোদিত ট্যারিফের সঠিক প্রয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ সরকারি নির্ধারিত হার ও শর্ত সম্পর্কে মাঠপর্যায়ে অস্পষ্টতা থাকলে তা যাত্রী ও নৌযান ব্যবহারকারীদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সরকারি ওয়েবসাইটেও বিজ্ঞপ্তি, আদেশ, পরিপত্র, নীতিমালা ও প্রকাশনা সংক্রান্ত তথ্যের পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে।
গোরকঘাটা নদীবন্দরে ট্যারিফ নিয়ে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক বিভ্রান্তি মূলত একটি বিজ্ঞপ্তিতে ট্যারিফ তফসিলের গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগগত শর্ত বাদ পড়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। উপজেলা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে বিজ্ঞপ্তি অপসারণ এবং ইজারাদারের লিখিত মুচলেকা নেওয়া হয়েছে।
তবে জনস্বার্থে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ট্যারিফ আদায়ে যেন কোনো ব্যাখ্যাগত অস্পষ্টতা না থাকে এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত ট্যারিফ তফসিলের প্রতিটি প্রযোজ্য শর্ত অক্ষরে অক্ষরে অনুসরণ করা হয়।
গোরকঘাটা নদীবন্দরে নিয়মিত তদারকি, অনুমোদিত ট্যারিফের দৃশ্যমান প্রদর্শন, রসিদ প্রদান এবং অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তির সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।