মঙ্গলবার, আগস্ট ২৫, ২০২৬

রা কি ফা আ ক্তা র র ত্না

  • 'বন্ধুত্ব চিরকাল'
  • ২০২৩-০৯-২২ ১৩:৪২:০৫

দোতলা বিআরটিসি বাস। রাজধানীতে দোতলা বাসের ভেতর একটা অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে। এই বাসে উঠলে কোথায় যেন হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। চমৎকার হেলেদুলে চলে। দেখতে জাহাজির মতো লাগে। মনে হয় হাজার মানুষের সুখ, দু:খ পেটে পুড়ে নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়ায় সে।
এমন করেই হেলেদুলে চলতে চলতে থামলো বাসটা।
পেছন থেকে দুই বয়স্ক লোক পড়িমরি করে উঠে এলো দোতলায়। দু'জনের মুখেই সাদা লম্বা দাড়ি। বেশভুষায় দারিদ্র্যের ছাপ স্পষ্ট। গায়ে জীর্ণ পাঞ্জাবি। তবে মুখে তাদের হাসি। পান খাওয়া মুখ। তারা যেভাবে উঠছে তাতে আরেকটু হলে পড়েই যেত। কয়েকজন দৌড়ে তাদেরকে ধরতে গেলে এক বৃদ্ধ বলল- আরে ধইরেন না। ধরা লাগবো না। আমরা  বুইড়া নাকি! 
কী মুশকিল! বয়স্ক লোকেরা যখন নিজেদের বৃদ্ধ বলতে নারাজ তখন ধরে নিতেই হয় তাদের মনের জোর সতের বছরের টগবগে যুবকদের চেয়েও বেশি। এদের সাথে পারা যায় না কোন কিছুতেই। 
লোক দুটা একেবারে সামনের সিটে গিয়ে বসলো। একজন বলল- এত সামনে আইলাম ক্যা?
অপরজন উত্তর দিল- আরে সামনে না বইলে দেখবি ক্যামনে ঢাকা শহর? উপরে থাইকা শহর দ্যাখ।
বলেই মুখে একটা পান পুড়ে দিল। কথা শুনে বোঝা গেল তাদের একজন আসছে ঢাকা শহর দেখতে। 
বাস এগোচ্ছে। নতুন আসা বৃদ্ধ বলল- আচ্ছা এই বাস যাইব কই? 
পাশের জন্য বলল- হে হে আমিওতো জানি না কই যাইব! 
নতুনজন কিছুটা চমকে উঠে বলল- ক্যারে তুই নিজেও জানস না এইডা কই যাইব তাইলে উপায় কী! চল নাইমা যাই। 
অপরজন বলল- আরে নাইমা কী হইবো। ঘুরতে আইছোস ঘুর, বাস যেইখানে মন চায় যাক। নে পান মুখে দে। বলেই নিজের হাতে পান সাজিয়ে তার হাতে দিল। চুন লাগিয়ে দিল আঙুলের ডগায়।
দু'জনই পান চাবাচ্ছে। একজন আরেকজনকে রাস্তার দু দিকের দৃশ্যবালি দেখাচ্ছে। সেগুলো নিয়ে গল্প করছে। 
তাদের কথায় বোঝা গেল তারা দ'জনেই ঘনিষ্ট  বন্ধু। একজন থাকে গ্রাম, আরেকজন  এই শহরেই।
 বাস টেকনিক্যাল এলে শহরে থাকা বৃদ্ধ বলল- হায় হায় রে দেখছস কামডা? টেকনিক্যাল আইসা পড়ছি। নাম নাম ।  দুজনেই উঠে দাঁড়ালো। একজন জানালা দিয়ে মাথা বের করে নিচে থাকা ড্রাইভারকে বলল- ড্রাইভারসাব বাস থামান। আমরা নাইমা যাই।
বাস থামলো। দুজন হাত ধরাধরি করে নেমে গেল। কী অপূর্ব দৃশ্য! এই বয়সে দুই বন্ধু কী মজাই না পাচ্ছে! তাদের পেছন পেছন আমিও নামলাম। 
তারা টেকনিক্যাল এসে এক পানের দোকান থেকে দুটা পান নিলো। পান মুখে দিয়ে  ফুটপাতে বসলো। পানের খয়েরী রস তাদের ঠোঁটের কর্নার বেয়ে নামতে লাগলো। দোকানী পানে ইচ্ছেমতন খয়ের দিয়েছে। 
নতুন আসা বৃদ্ধ বলল- চল বাসায় যাই। 
অপরজন বলল- আরে কেবলতো সন্ধ্যা নামছে। আরেকটু বস। তারপর যাই। বলেই আবার উঠে দাঁড়ালো। বলল- চল তোরে হালিম খাওয়াই। খুব টেস্ট। 
অন্যজন বলল- হায় হায় তোর বিড়ির অভ্যাস যায়নাই? আমারে একটু দে তো কেমন লাগে দেখি!
দুজন আবার হাত ধরে হাঁটা শুরু করলো। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মিলেছে দুই বন্ধু। কী দারুণ বন্ধুত্ব তাদের! তারা যেন ফিরে গেছে সেই ছোট বেলায়।
তাদের এমন সম্পর্ক দেখে আমারও খুব ইচ্ছে করছে বন্ধুদের কাছে ফিরে যেতে। কিন্তু সবাই যে খুব ব্যস্ত। 
এই শহরে প্রায় আমি বিআরটিসি বাসের দিকে তাকিয়ে থাকি। আজো কাজ ছাড়াই সারাদিন গন্তব্যহীন হয়ে দোতলা বাসে বসে ছিলাম।
এই শহরে আমি রোজ মহাদেব সাহার কবিতাটি মনে মনে আবৃত্তি করি বাসে বসে-
আমি একটি বন্ধু খুঁজছিলাম...
সে এসে অন্ধকারে চতুর চোরের মতো
আমার পকেট থেকে নেবে সব স্থলপদ্মগুলি
বলবে কানের কাছে চুপি চুপি অসম্ভব বদমাশ সে,
– চল ঘুরে আসি রাতের শো থেকে
তারপর নিয়ে যাবে ক্রামাগত ভুল ঠিকানায়...

 

 


এ জাতীয় আরো খবর