মধ্যপ্রাচ্য থেকে সবাই আসে পেট্রো-ডলার নিয়ে; সবুজ চাচা ফিরে এলো কব্জিতে পেজার লাগিয়ে। দুবাইয়ের ডাক্তার বলে দিয়েছে—যেকদিন টিক টিক, তারপর শেষ!
সবুজ চাচাকে রাখা হয়েছে পিজি হাসপাতালে। বিলু ফুপি পিজির মেট্রন। তার প্রযত্নে দুসপ্তাহ ধরে আছে। বাড়ির মেয়েরা দুইবেলা সুপ নিয়ে যায়। মিথি আর দোলন বুঝে গেছে, ওদের বাবা বাঁচবে না। ওরা আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে মৃত্যু নিয়ে আলাপ করে। তখন একটা রেলগাড়ি ঝমঝম করে চলে যায়। আমপাতার ঝরঝর শব্দ থেমে গেলে দোলন বালে—মৃত্যু হলো রেলগাড়ি; যে ওঠে সে চলে যায়।
মিথি জানতে চায়—কোথায় যায়?
আল্লার কাছে।
আল্লা কোথায় থাকে?
আকাশে।
মিথি হাসে—ভাই, তুই একটা বুদ্ধু। রেলগাড়ি টঙ্গি পর্যন্ত যায়। আকাশেতো বিমান চলে। হি, হি, হি।
ঘর থেকে বেরিয়ে মালা চাচি হাঁক ছাড়ে—এই, তোদের কতোবার বলেছি, রেললাইনে যাবি না! বাপের আগে মরতে চাস! হাসপাতালে যাবি? তোদের বাপ তোদেরকে দেখতে চায়।
মিথি বলে—আব্বু কথা বলে না; শুধু তাকিয়ে থাকে। আমরা যাবো না; কি বলিস, ভাই?
দোলন বলে—আম্মু, আমরা দাদীর সাথে পরে যাবো।
তাইলে বাসায় গিয়ে স্নান করে খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে নিয়ো। আমার ফিরতে রাত হয়ে যাবে।
আমি আর মালা চাচি রেললাইন পেরিয়ে পিজির উদ্দেশ্যে রিক্সায় চড়ি। টানা হরতাল-অবরোধে শহরটার যা-তা অবস্থা। বাচ্চাদের স্কুল কামাই যাচ্ছে। যখন তখন ককটেল ফুটছে; আর পুলিশের ধাওয়ায় ছন্দহারা হয়ে পড়ছে পথঘাট। এরশাদ হারামজাদাটা ইলেকশন ডিক্লার করে নেমে যাক; তা-না; মানুষ মারতেছে! আরে, মানুষ মেরে ক্ষমতায় টিকতে পারবি! মালা চাচি বলে—তোমার চাচা দিনে দিনে ফুলে নীল হয়ে যাচ্ছে; তাকাতে পারি না।
আমি চুপ করে থাকি। পিজির গেটে রিক্সা থামাই। চাচি বলে—নেমে যাচ্ছো যে?
আমি টিএসসিতে যাবো; জোটের মিটিং আছে। ফেরার পথে দেখে যাবো।
মালা চাচি দীর্ঘশ্বাস ফেলে—যাও। আমার দুনিয়াটা আন্ধার হয়ে আসতেছে।
সংহার আর সম্ভাবনার সুতোর উপর আমাদের প্রতিদিন বয়ে চলে। আমরা সামরিক একনায়কের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছিলাম; যদি গনতন্ত্রের আভাস মেলে; মৃত্যু যেখানে তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। অথচ সবুজ চাচা অনেক স্বপ্ন নিয়ে দুবাই গিয়েছিলো—রেললাইনের পাশে আমাদের টিনের বাড়িটাকে দালান বানাবে বলে। চাচিও সায় দিয়েছিলো আরেকটু স্বাচ্ছন্দের আশায়। এখন ক্যামন মৃত্যু ক্রয় করে ফিরে এসেছে চাচাটা! ভাবতে গেলে পৃথিবীটা সত্যি অন্ধকার হয়ে আসে।
টিএসসির দিকে হাটতে হাটতে সিগারেট ধরাবো, আশ্চর্য, হাতথেকে লাইটারটা পড়ে যায়; আর আমার চোখ ফেটে কান্না আসে। দেখি, একটা মিছিল আসতেছে। কেউ একজন, চেনা, ডাক দেয়—আয়, মিছিলে আয়…। আমি ওদের সাথে মিশে গিয়ে শ্লোগান ধরি—একদফা, এক দাবি/ এরশাদ তুই কবে যাবি…।
আমার কান্না শ্লোগানে হারিয়ে যায়। মনে হয়, মৃত্যুর চেয়ে আগামী অনেক বড়।