মালয়েশিয়ার প্রবেশপথ ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান দুর্নীতি বন্ধ না করে শুধুমাত্র অবৈধ অভিবাসীদের আটক করে সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন মালয়েশিয়া করাপশন ওয়াচ (এমসিডব্লিউ)-এর সভাপতি জাইস আব্দুল کریم। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় যে সিন্ডিকেট ও দুর্নীতিবাজ চক্র অর্থের বিনিময়ে বিদেশিদের অবৈধ প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
সম্প্রতি মালয়েশিয়া জুড়ে অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ‘অপ মেগা’ (Op Mega) এবং ‘অপস কুতিপ’ (Ops Kutip) এর মতো একের পর এক বড় ধরনের চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের শত শত কর্মীকে আটক করা হয়েছে। এই সাঁড়াশি অভিযানের পটভূমিতেই এমসিডব্লিউ সভাপতির এমন চাঞ্চল্যকর পর্যবেক্ষণ সামনে এলো।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও স্বাধীন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ৪০ লাখ undocumented বা অনিয়মিত অভিবাসী শ্রমিক রয়েছেন। মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশন (MACC) ইতোমধ্যেই দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগের ভেতরে থাকা কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের সন্ধান পেয়েছে, যারা তথাকথিত 'কাউন্টার সেটিং' (Counter Setting) বা পাসপোর্টের নজরদারি ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করে অবৈধ প্রবেশে সহায়তা করে আসছিল। এমনকি সম্প্রতি অবৈধ শ্রমিকদের অবৈধভাবে সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ গ্রহণের দায়ে ঊর্ধ্বতন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদেরও গ্রেফতারের নজির মিলেছে।
এমসিডব্লিউ প্রধানের মতে, দেশের অভ্যন্তরে সাধারণ প্রান্তিক শ্রমিকদের ওপর অভিযান চালানোর চেয়ে বিমানবন্দর ও স্থল সীমান্তের মতো প্রবেশপথগুলোতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা অধিকতর জরুরি। অপরাধের মূল উৎস বা চোরাপথ সচল রেখে কেবল মাঠপর্যায়ে ধরপাকড় চালানো এক ধরনের অসম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া।
মালয়েশিয়ার এই কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের মুখে বাংলাদেশি প্রবাসী ভাইবোন এবং দেশে থাকা তাঁদের মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনদের সর্বোচ্চ সতর্ক ও সচেতন থাকা আবশ্যক। আইনি সুরক্ষা ও নিজের ভবিষ্যৎ সুসংহত করতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
দালাল সিন্ডিকেট থেকে সম্পূর্ণ দূরত্ব: যারা স্বল্প সময়ে বা আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধ পথে বা ত্রুটিপূর্ণ নথিপত্রে মালয়েশিয়ায় প্রবেশের সুযোগ দাবি করে, তাদের থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন। মনে রাখবেন, দালালের পাতা ফাঁদে পা দিলে প্রকারান্তরে আপনি ইমিগ্রেশন আইনের চোখে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হতে পারেন।
পারিবারিক সচেতনতা: প্রবাসীদের মা-বাবা ও স্বজনদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ, প্রিয়জনের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কোনো অবস্থাতেই যাচাই-বাছাই ছাড়া এবং সরকারি অনুমোদিত বৈধ চ্যানেল ব্যতীত কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দেবেন না।
বৈধ নথিপত্রই একমাত্র সুরক্ষা: প্রবাসে একজন নাগরিকের সবচেয়ে বড় আইনি ঢাল হলো তাঁর সঠিক ভিসা ও বৈধ কাগজপত্র। নিয়োগকর্তার পরিবর্তন বা কাগজপত্রের মেয়াদ সংক্রান্ত জটিলতা থাকলে সর্বদা হাইকমিশন বা সংশ্লিষ্ট আইনি সহায়তাকেন্দ্রের মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করুন।
মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার যে দাবি উঠেছে, তা মূলত প্রবাসীদের স্বপ্নকে নিরাপদ করার একটি সুযোগ। কোনো অসদুপায় বা সিন্ডিকেটের কারসাজিতে যেন আপনার কষ্টের উপার্জন ও জীবন ঝুঁকির মুখে না পড়ে, তার দায়িত্ব সবার আগে আপনার নিজের। বৈধ ও আইনি পথে বিদেশ গমন এবং প্রবাস জীবনে সঠিক নিয়মকানুন মেনে চলাই একজন প্রবাসী বাংলাদেশির প্রকৃত নিরাপত্তা ও দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার একমাত্র উপায়।