শুক্রবার, জুলাই ১০, ২০২৬

'বনের নীরব অতিথি',পর্ব-২৪

  • সকালের আলো প্রতিবেদক
  • ২০২৬-০৭-০৯ ১৩:১৯:১৫
ফাইল ছবি

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী-পর্ব ২৪ 

সকালের আকাশে সাদা মেঘ ভাসছে। রাহি আর অরণ স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে দৌড়ে এল শিসু।

-'রাহি! অরণ! তাড়াতাড়ি চলো! বাঁশঝাড়ের পাশে সবাই ভিড় করেছে!'

তিনজন ছুটে গেল।

দেখে অবাক হয়ে গেল তারা।

বাঁশঝাড়ের ছায়ায় ভয়ে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট মায়া হরিণের শাবক। তার বড় বড় চোখে আতঙ্ক, শরীর কাঁপছে। আশপাশে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

একজন বললেন,
-'এটাকে বাড়িতে নিয়ে গেলে পোষা যাবে।'

আরেকজন বললেন,
-'না না, আগে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখি।'

রাহি তাড়াতাড়ি সামনে এগিয়ে বলল,
-'দয়া করে কেউ ওর কাছে যাবেন না। ও খুব ভয় পেয়েছে।'

ঠিক তখনই পাশের পুরোনো বটগাছের পাতা নড়ে উঠল।

বটদাদুর শান্ত কণ্ঠ শোনা গেল,
-'যে প্রাণী ভয়ে মানুষের কাছে চলে আসে,তাকে আরও ভয় দেখানো নয়,নিরাপত্তা দেওয়াই মানুষের পরিচয়।'

অরণ চারদিকে তাকিয়ে বলল,
-'কিন্তু ও এখানে এলো কীভাবে?'

বটদাদু ধীরে বললেন,
-'কয়েক দিন আগে বনের পাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার করা হয়েছে। অনেক বন্যপ্রাণী তাদের চেনা পথ হারিয়ে ফেলেছে। এই ছোট্ট শাবকটি হয়তো তার মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।'

শিসুর চোখ ভিজে উঠল।
-'তাহলে ওর মা এখন ওকে খুঁজছে?'

-'হয়তো খুঁজছে। আর এই শাবকটিও নিজের ঘরে ফিরতে চাইছে।'

রাহি গ্রামের মানুষদের অনুরোধ করল,
-'দয়া করে কেউ ওকে ধরবেন না। আমরা বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করি।'

স্কুলের প্রধান শিক্ষকও খবর পেয়ে সেখানে এলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ফোন করলেন।
অপেক্ষার সময় রাহি, অরণ আর শিসু সবাইকে অনুরোধ করল, যেন কেউ শাবকের খুব কাছে না যায়। দূর থেকে শান্ত পরিবেশ রাখা হলো। একটি পাত্রে পরিষ্কার পানি রাখা হলেও কেউ জোর করে তাকে কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করল না।

কিছুক্ষণ পর বন বিভাগের একটি দল এসে পৌঁছাল।

একজন কর্মকর্তা শাবকটিকে দেখে বললেন,
-'তোমরা খুব ভালো কাজ করেছ। ভিড় নিয়ন্ত্রণ না করলে বা কেউ ধরে ফেললে ও আরও ভয় পেয়ে যেতে পারত।'

সতর্কতার সঙ্গে শাবকটিকে একটি নিরাপদ খাঁচায় রাখা হলো। কর্মকর্তারা জানালেন,পরীক্ষা করে তাকে তার নিরাপদ বনাঞ্চলে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

গাড়িটি ধীরে ধীরে চলে যেতে লাগল।

শিসু হাত নেড়ে বলল,
-'আবার নিজের মায়ের কাছে ফিরে যেও, ছোট্ট বন্ধু!'

রাহির চোখে আনন্দের ঝিলিক।
-'আজ আমরা কোনো প্রাণীকে নিজেদের কাছে রাখিনি। তাকে তার নিজের পৃথিবীতে ফিরে যেতে সাহায্য করেছি।'

বটদাদু মৃদু হেসে বললেন,
-'মনে রেখো,বন শুধু গাছের নাম নয়। বন হলো অসংখ্য প্রাণীর ঘর। সেই ঘর নিরাপদ থাকলেই মানুষও নিরাপদ থাকবে।'

অরণ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-'আমরা যদি বন কেটে ফেলি, তাহলে একদিন বনের অতিথিরা আমাদের গ্রামে আসবে। কিন্তু সেটা আনন্দের খবর হবে না, বরং তাদের বিপদের সংকেত হবে।'

বটদাদু মাথা নেড়ে বললেন,
-'ঠিক তাই। প্রকৃতিকে তার নিজের জায়গায় বাঁচতে দিতে শিখলেই মানুষ সত্যিকারের প্রকৃতিবন্ধু হয়ে ওঠে।'

সেদিন বিকেলে রাহি, অরণ আর শিসু গ্রামের শিশুদের নিয়ে একটি ছোট সভা করল। তারা সিদ্ধান্ত নিল, কেউ যদি কখনো কোনো বন্যপ্রাণীকে পথ হারিয়ে গ্রামে দেখতে পায়, তাহলে তাকে বিরক্ত করবে না, পোষার চেষ্টা করবে না এবং দ্রুত বড়দের ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাবে।

ফেরার পথে দূরের সবুজ বনটার দিকে তাকিয়ে রাহি মনে মনে বলল,
-'বন ভালো থাকলেই পৃথিবী ভালো থাকবে।'

আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি কোনো বন্যপ্রাণীকে ধরে রাখব না বা কষ্ট দেব না। পথ হারিয়ে মানুষের এলাকায় এলে তাকে নিরাপদে উদ্ধার করতে বড়দের এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেব।

সবুজ তথ্যঃ
বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বাসস্থান হলো বন, জলাভূমি বা প্রাকৃতিক পরিবেশ। বন ধ্বংস, আগুন, অতিরিক্ত শব্দ এবং মানুষের অনুপ্রবেশের কারণে অনেক প্রাণী পথ হারিয়ে লোকালয়ে চলে আসে। তাদের নিরাপদে প্রকৃত আবাসে ফিরিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে দায়িত্বশীল কাজ।

আগামীকাল পর্ব-২৫-'গাছের চিঠি'


এ জাতীয় আরো খবর