শনিবার, জুলাই ১১, ২০২৬

'গাছের চিঠি'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৭-১০ ২২:১২:৩৯
ছবি: সংগৃহীত।

প্রিয় বন্ধুরা গত পর্বে আমরা দেখেছি,একটি হরিণশাবককে তার নিজের বনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আজকের গল্পে আমরা দেখব,একটি শতবর্ষী গাছ কীভাবে পুরো গ্রামের ইতিহাস, প্রকৃতি এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী,পর্ব-২৫:
বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে মাটির বুকে নেমে আসছে। রাহি, অরণ আর শিসু গ্রামের পুরোনো পথ ধরে হাঁটছিল। পথের শেষে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক রেইনট্রি। গ্রামের সবাই তাকে 'বড় গাছ' বলেই চেনে।
গাছটির নিচে কত গল্প, কত স্মৃতি!
কেউ এখানে বিশ্রাম নিয়েছে,কেউ বই পড়েছে, কেউ আবার বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে আশ্রয় নিয়েছে।

হঠাৎ শিসু দৌড়ে এসে বলল,
-'রাহি, দেখো! গাছটার গায়ে লাল রঙ দিয়ে একটা দাগ টানা হয়েছে।'

রাহি কাছে গিয়ে দেখল, সত্যিই তাই। গাছের কাণ্ডে সাদা কাগজও লাগানো।
তাতে লেখা, 'রাস্তা প্রশস্ত করার কাজে এই গাছ অপসারণ করা হবে।'

অরণ চুপ হয়ে গেল।
-'তাহলে এত বড় গাছটা কেটে ফেলা হবে?'

ঠিক তখনই হালকা বাতাস বইতে শুরু করল। পাতাগুলো একসঙ্গে দুলে উঠল।

বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এল,
-'কোনো গাছ শুধু গাছ নয়। প্রতিটি পুরোনো গাছ সময়ের এক একটি জীবন্ত দলিল।'

রাহি গাছের কাণ্ডে হাত রাখল।
তার মনে হলো, যেন কেউ খুব আস্তে আস্তে কথা বলছে।
'আমি এই গ্রামের অনেক জন্মদিন দেখেছি। অনেক শিশুকে বড় হতে দেখেছি। ঝড়ের রাতে আশ্রয় দিয়েছি। পাখিদের বাসা হয়েছি। ক্লান্ত পথিককে ছায়া দিয়েছি। এখন কি আমার কথা কেউ শুনবে না?'

রাহি চমকে উঠল।
-'অরণ, তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ?'

অরণ মৃদু হেসে বলল,
-'হয়তো গাছ কখনো মুখে কথা বলে না। কিন্তু যে মন দিয়ে শোনে, সে গাছের ভাষা বুঝতে পারে।'

পরদিন স্কুলে গিয়ে রাহি বিষয়টি শিক্ষককে জানাল।

শিক্ষক বললেন,
-'রাস্তা উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু যদি এমনভাবে পরিকল্পনা করা যায়,যাতে গাছটিও বেঁচে থাকে, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে ভালো সমাধান।'

সেদিনই গ্রামের মানুষ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর স্থানীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা গাছটির কাছে জড়ো হলেন।

সবাই মিলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন।

একজন প্রবীণ মানুষ বললেন,
-'এই গাছটি আমি ছোটবেলায়ও দেখেছি। আমার বাবাও এর ছায়ায় বসতেন।'

একজন কৃষক বললেন,
-'গরমের দিনে এই গাছ না থাকলে এই রাস্তা দিয়ে হাঁটাই কঠিন হয়ে যাবে।'

সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে আবেদন জানানো হবে, যেন রাস্তার নকশায় সামান্য পরিবর্তন এনে গাছটি রক্ষা করা যায়।

কয়েক দিন পর সুখবর এল।

নতুন পরিকল্পনায় গাছটি আর কাটতে হবে না।

রাস্তা একটু বাঁক নিয়েই তৈরি হবে।

খবরটি শুনে শিসু আনন্দে হাততালি দিল।
-'দেখেছ! গাছের চিঠি সবাই পড়েছে।'

বটদাদু হেসে বললেন,
-'মানুষ যখন উন্নয়ন আর প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নিতে শেখে, তখনই সত্যিকারের অগ্রগতি হয়।'

সন্ধ্যায় রাহি গাছটির নিচে দাঁড়াল।

বাতাসে পাতাগুলো মৃদু শব্দ তুলল।

তার মনে হলো, যেন গাছটি বলছে,

'ধন্যবাদ। আমাকে বাঁচিয়ে তোমরা শুধু একটি গাছ নয়,আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ছায়া, একটি ইতিহাস আর অসংখ্য প্রাণের আশ্রয় বাঁচিয়ে রাখলে।'

রাহি আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
-'আমরা কথা দিচ্ছি, তোমার মতো প্রতিটি গাছের কথাও আমরা শুনব।'

আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি অকারণে কোনো গাছ কাটব না। পুরোনো গাছ সংরক্ষণে সচেতন থাকব এবং উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৃতি রক্ষার কথাও সবাইকে মনে করিয়ে দেব।

সবুজ তথ্যঃ
একটি পরিণত গাছ শুধু অক্সিজেনই দেয় না। এটি পাখি, কাঠবিড়ালি, প্রজাপতি ও অসংখ্য ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসস্থল। বড় গাছ স্থানীয় তাপমাত্রা কমাতে, বাতাসের মান উন্নত করতে এবং বৃষ্টির পানি মাটিতে ধরে রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


আগামীকাল পর্ব-২৬ 'বীজের গোপন ভ্রমণ'।


এ জাতীয় আরো খবর