সোমবার, জুলাই ১৩, ২০২৬

বীজের গোপন ভ্রমণ

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৭-১২ ০৮:৩৫:৪০
ফাইল ছবি

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
পর্ব-২৬: 

সকালের হালকা বাতাসে গ্রামের পথ যেন আরও সুন্দর লাগছিল। রাহি, অরণ আর শিসু বটদাদুর কাছে যাওয়ার জন্য মাঠের আইল ধরে হাঁটছিল।

হঠাৎ শিসু থেমে গেল।
-'অরণ, দেখো! আমার জামায় এই তুলার মতো জিনিসগুলো কোথা থেকে এলো?'

অরণ কাছে গিয়ে দেখল, জামায় ছোট ছোট সাদা তুলার মতো অনেক বীজ আটকে আছে।

রাহি একটি হাতে নিয়ে বলল,
-'অদ্ভুত! এত হালকা যে একটু ফুঁ দিলেই উড়ে যাচ্ছে।'

ঠিক তখনই বাতাসে বটগাছের ডালপালা দুলে উঠল।

বটদাদু মুচকি হেসে বললেন,
-'আজ তোমরা প্রকৃতির এক নীরব ভ্রমণকারীর সঙ্গে দেখা করেছ।'

শিসু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-'ভ্রমণকারী? এ তো একটা ছোট্ট বীজ!'

বটদাদু বললেন,
-'হ্যাঁ। কিন্তু এই ছোট্ট বীজই একদিন বিশাল গাছে পরিণত হতে পারে। আর সে কখনো এক জায়গায় বসে থাকে না। বাতাস, পানি, পাখি, এমনকি মানুষের সাহায্যেও সে নতুন ঠিকানা খুঁজে নেয়।'

রাহির চোখে কৌতূহল।
-'চলো, আজ আমরা দেখি একটি বীজের যাত্রা কীভাবে শুরু হয়।'

তিন বন্ধু মাঠের দিকে এগিয়ে গেল।
দেখল, একটি শালিক পাকা ফল ঠোঁটে করে নিয়ে উড়ে গেল। কিছু দূরে গিয়ে ফলের বীজ মাটিতে পড়ে রইল।

অরণ বলল,
-'তাহলে পাখিরাও নতুন গাছ জন্মাতে সাহায্য করে!'

-'অবশ্যই,' বললেন বটদাদু। 'অনেক পাখি ও প্রাণী ফল খায়। পরে অন্য জায়গায় গিয়ে বীজ ফেলে দেয়। সেখান থেকেই নতুন গাছ জন্মায়।'

আরও কিছু দূর এগিয়ে তারা একটি ছোট খালের ধারে পৌঁছাল।

পানিতে ভেসে যাচ্ছে কয়েকটি নারকেলের শুকনো খোসা।

বটদাদু বললেন,
-'সব বীজ বাতাসে উড়ে না। কিছু বীজ পানিতে ভেসেও অনেক দূর চলে যায়।'

শিসু মুগ্ধ হয়ে বলল,
-'তাহলে নদীও গাছের বন্ধু!'

-'হ্যাঁ,' রাহি হাসতে হাসতে বলল, 'প্রকৃতিতে কেউ একা নয়।'

ঠিক তখন অরণ লক্ষ্য করল, তার জুতার সঙ্গে কাঁটার মতো একটি শুকনো বীজ আটকে আছে।

সে সেটি খুলে দেখাল।

বটদাদু বললেন,
-'এটাও প্রকৃতির বুদ্ধি। কিছু বীজ মানুষের জামা, পশুর লোম বা জুতায় আটকে অনেক দূরে চলে যায়।'

বিকেলে চারজন মিলে স্কুলের খালি জায়গায় গেল।

রাহি বলল,
-'চলো, আজ আমরা শুধু গল্প শুনব না। কিছু বীজ মাটিতেও পুঁতে দিই।'

শিক্ষকও তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। সবাই মিলে কয়েকটি দেশীয় গাছের বীজ যত্ন করে রোপণ করল।

প্রতিটি বীজের পাশে ছোট কাঠি গেড়ে তার নাম লেখা হলো।

শিসু একটি বীজের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-'তুমি তাড়াতাড়ি বড় হয়ে যেও। আমরা আবার দেখা করতে আসব।'

সবাই হেসে উঠল।

বটদাদু শান্ত কণ্ঠে বললেন,

-'মনে রেখো, আজ যে বীজটি তোমরা মাটিতে রাখলে, হয়তো একদিন তার ছায়ায় কোনো শিশু বই পড়বে, কোনো পাখি বাসা বাঁধবে, কোনো পথিক বিশ্রাম নেবে।'

সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে।

রাহি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
-'একটি বীজ কখনো শুধু একটি বীজ নয়। তার ভেতরে লুকিয়ে থাকে একটি ভবিষ্যৎ বন।'

অরণ মাথা নাড়ল।
-'আর সেই ভবিষ্যৎকে বড় করার দায়িত্ব আমাদের।'

শিসু দুই হাত তুলে বলল,
-'আজ থেকে আমিও বীজের বন্ধু!'

বাতাস আবার মৃদু করে বয়ে গেল।

মনে হলো, যেন অদৃশ্য কোনো বীজ নতুন কোনো যাত্রায় বেরিয়ে পড়েছে।

আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি ফলের বীজ বা দেশীয় গাছের বীজ নষ্ট করব না। সুযোগ পেলে উপযুক্ত স্থানে বীজ রোপণ করব এবং নতুন গাছ জন্মাতে যত্ন নেব।

সবুজ তথ্যঃ
সব গাছের বীজ একইভাবে ছড়ায় না। কিছু বীজ বাতাসে উড়ে, কিছু পানিতে ভাসে, কিছু পাখি ও প্রাণীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, আবার কিছু বীজ মানুষের অজান্তেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে যায়। এভাবেই প্রকৃতি নিজেই নতুন বন তৈরির কাজ চালিয়ে যায়।


আগামীকাল পর্ব-২৭ 'পাখিদের সকালবেলার সভা'।


এ জাতীয় আরো খবর