বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির ফলে বিশ্ব এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতায় তথ্যপ্রবাহ যেমন দ্রুত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে তথ্যের অপব্যবহারও।
ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আজ গণমাধ্যমের বিকল্প শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর আড়ালে এক শ্রেণির অর্থলোভী অসাধু ইউটিউবার, ফেসবুক পেইজ পরিচালনাকারী ও কথিত অনলাইন সাংবাদিক অপসাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজে বিভ্রান্তি, গুজব, ভয়ভীতি ও অস্থিরতা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
সচেতন মহল বলছে,এই অপতৎপরতা এখন সমাজ ও জাতির জন্য এক নীরব কিন্তু ভয়াবহ হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
অপসাংবাদিকতার বিস্তার কেন বাড়ছে?বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন, অধিক ভিউ, ফলোয়ার ও অর্থ উপার্জনের প্রতিযোগিতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
ফলে অনেকেই সাংবাদিকতার ন্যূনতম নীতিমালা, তথ্য যাচাই ও পেশাগত দায়িত্ববোধকে উপেক্ষা করে চটকদার শিরোনাম ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও প্রকাশ করছে।
একটি মোবাইল ফোন,একটি ফেসবুক পেইজ কিংবা ইউটিউব চ্যানেল খুলেই কেউ কেউ নিজেদের “সাংবাদিক” পরিচয় দিচ্ছে।
অথচ তাদের অনেকের নেই সাংবাদিকতার কোনো প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা বা আইনি জ্ঞান। তারা অনেক সময় ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা অর্থ আদায়ের জন্য অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।
মিথ্যা তথ্য ও গুজবের ভয়াবহতা অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় ছোটখাটো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। কোথাও পুরোনো ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যকে “ব্রেকিং নিউজ” আকারে প্রচার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি গুজব বা বিভ্রান্তিকর ভিডিও মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক,ক্ষোভ
ও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
কখনো কখনো এসব গুজবকে কেন্দ্র করে সামাজিক সংঘাত, হামলা, ভাঙচুর ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঘটনাও ঘটছে।
ব্ল্যাকমেইল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু ইউটিউবার ও ফেসবুক পেইজ পরিচালনাকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও প্রকাশ করে পরে তা সরিয়ে নেওয়ার বিনিময়ে অর্থ দাবি করছে।
অনেক ব্যবসায়ী,জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক,সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষ এই ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী,“সংবাদ প্রকাশ” কিংবা “লাইভ ভিডিও” দেখানোর ভয় দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের ঘটনাও ঘটছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তার বিরুদ্ধে আরও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
প্রকৃত সাংবাদিকতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাংবাদিকতা একটি দায়িত্বশীল পেশা। এর মূল ভিত্তি হচ্ছে সত্যতা, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থ।
কিন্তু কিছু অপসাংবাদিকের কারণে বর্তমানে প্রকৃত সাংবাদিকরাও নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখে পড়ছেন।
অনেক সাধারণ মানুষ এখন প্রকৃত সাংবাদিক ও ভুয়া অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছেন না। ফলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তরুণ সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে,দ্রুত ভাইরাল হওয়ার সংস্কৃতি তরুণ সমাজের একটি অংশকে বিপথে ঠেলে দিচ্ছে। সত্য যাচাইয়ের চেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। এতে নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক অসহিষ্ণুতা ও দায়িত্বহীন আচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অনেক তরুণ সহজে অর্থ উপার্জনের আশায় অপপ্রচার, গুজব ও ব্যক্তিগত আক্রমণকে“কনটেন্ট” হিসেবে ব্যবহার করছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইন প্রয়োগ ও সচেতনতার প্রয়োজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপসাংবাদিকতা প্রতিরোধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে প্রয়োজন।
মিথ্যা তথ্য,গুজব ও মানহানিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সচেতন নাগরিকদের মতে,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য শেয়ার বা প্রচার না করা।
গুজব প্রতিরোধে সচেতন থাকা এবং ভুয়া তথ্য প্রচারকারীদের বর্জন করা এখন সময়ের দাবি।
রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, অপসাংবাদিকতা রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
পাশাপাশি প্রকৃত সাংবাদিকতা চর্চার পরিবেশ নিশ্চিত করা, অনলাইন গণমাধ্যমের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার জরুরি।
একইসঙ্গে সামাজিক,পারিবারিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষা ও দায়িত্বশীল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
দায়িত্বশীল গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের বিবেক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু অপসাংবাদিকতা, গুজব ও অর্থলোভী অসাধু ইউটিউবার-ফেসবুকারদের অপতৎপরতা সেই বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
ব্যক্তি স্বার্থে মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সমাজকে অস্থিতিশীল করার এই প্রবণতা রোধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর ভয়াবহ পরিণতি পুরো জাতিকে বহন করতে হতে পারে । সচেতন মহলের অভিমত সত্য ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিকল্প নেই। তাই সমাজ,রাষ্ট্র,আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যম ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগেই অপসাংবাদিকতার এই নীরব হুমকি মোকাবিলা সম্ভব।