বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬

ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা অনুমোদন,উত্তরে অসন্তোষ

  • হাসান মেহেদী:
  • ২০২৬-০৭-০১ ২০:০৪:২৪

নতুন উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত না হতে  দুটি ইউনিয়নের প্রবল আপত্তি, আন্দোলন আর উত্তরের মানুষের গণশুনানির মতামতকে উপেক্ষা করেই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার উত্তরাঞ্চল নিয়ে প্রস্তাবিত ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা গঠনের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাসিন্দাদের। ফলে নতুন উপজেলা ঘোষণার আনন্দ উত্তর ফটিকছড়ির সিংহভাগ মানুষকেই স্পর্শ করতে পারেনি বলে মন্তব্য তাদের। নতুন উপজেলার সদর দপ্তর স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান নিয়েও বিরাজ করছে অসন্তোষ।  
দীর্ঘদিনের দাবি, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে নতুন ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। আজ (বুধবার)  সচিবালয়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২১তম সভায় প্রধানমন্ত্রী নতুন এ উপজেলা গঠনের অনুমোদন দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ তথ্য গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন। নতুন এ উপজেলা ঘোষণার পরপরই সদর দপ্তরের অবস্থানকে কেন্দ্র করে নতুন অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, উপজেলা ঘোষণার পর একাংশ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও কার্যত ছয় ইউনিয়নের চারটির অধিবাসীই এটিকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়েছেন। নতুন উপজেলার নিকটবর্তী হওয়ায় ভূজপুর ও হারুয়ালছড়ির জনগণ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও ভূজপুর থেকে প্রায় ৩২কিলোমিটার দূরবর্তী  বাগানবাজার এবং দাঁতমারা, নারায়ণহাটের জনগণ শুরু থেকেই যৌক্তিক স্থানে উপজেলা সদর দপ্তরের দাবি জানিয়ে আসছিল। অন্যদিকে সুয়াবিলের জনগণের দাবি তারা দক্ষিণ ফটিকছড়ির সাথেই থাকবে।
এমন পরিস্থিতিতে  নতুন উপজেলার পুনর্বিন্যাস করে যৌক্তিক স্থানে সদর দপ্তর ঘোষণার দাবিতে  আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাসিন্দারা। 
উপজেলা ঘোষণার সাথে সাথে ভূজপুরের জনগণ  সরকারের এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলনে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান। হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের  চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন,  উপজেলা গঠনের মধ্য দিয়ে এলাকার তৃণমূলের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে এবং সরকারের সেবাপ্রাপ্তিও সহজ হবে।
অন্যদিকে, উপজেলার উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গণশুনানির সুপারিশ ও প্রশাসনিক যৌক্তিকতাকে উপেক্ষা করে সদর দপ্তরের অবস্থান নির্ধারণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়াই একমাত্র পথ।
উপজেলা ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায়  ইউনিয়ন নারায়নহাটের বাসিন্দা ও সরকারের সাবেক এক সচিব মেজবাহ উদ্দিন বলেন, সুয়াবিল ও উত্তরের তিনটি ইউনিয়ন ভূজপুরে উপজেলা হলে তাদের কোনো কাজে আসবে না; বিধায় নতুন উপজেলার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আন্দোলন ও যুগপৎ আইনি কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। আমরা ব্যক্তিস্বার্থের উপজেলা চাই না। দাঁতমারা ইউনিয়নের বাসিন্দা, উত্তর ফটিকছড়ি নাগরিক ফোরামের যুগ্ম আহবায়ক তৌহিদুল আলম চৌধুরী জানান, ঘোষিত উপজেলার সিংহভাগ মানুষের দাবিকে উপেক্ষা করে বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত আমরা মানি না। আমরা সরকারের কাছে স্পষ্ট তিনটা দাবি জানাচ্ছি- ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার সদর উত্তরাঞ্চলেই হতে হবে, প্রস্তাবিত ইউনিয়ন বিভাজনের বিষয়টি সুষ্ঠুভাবে দ্রুততম সময়ে শেষ করতে হবে এবং দাঁতমারা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রকে থানায় উন্নীত করেই নতুন উপজেলা ঘোষণা করতে হবে।
স্থানীয়দের দাবি, নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ গণশুনানিতে নারায়ণহাট ও দাঁতমারার মধ্যবর্তী একটি সুবিধাজনক স্থানে সদর দপ্তর স্থাপনের বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনের সরেজমিন পরিদর্শন, যোগাযোগব্যবস্থা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনসেবার বিষয় বিবেচনায় জুজখোলা মৌজায় সদর দপ্তর স্থাপনের প্রস্তাবও উঠে আসে। কিন্তু এসব উপেক্ষা করে পরে ভিন্ন এক স্থানের  প্রস্তাব পাঠানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের ধারণা, সেই স্থানটি ঠিক রেখেই নিকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন বাস্তবায়নের পথে। এরপর থেকেই উত্তরাঞ্চলের ছয় ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
সদর দপ্তরের অবস্থান নিয়ে চলমান এ বিরোধের জেরে গত মঙ্গলবার উপজেলার হেয়াকো বাজার, নারায়ণহাট, বালুটিলা ও সুয়াবিল এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয়রা। এতে কয়েক ঘণ্টা ঢাকা–খাগড়াছড়ি ও খাগড়াছড়ি–চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
আন্দোলনকারীরা বলেন, নতুন উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্তকে তারা স্বাগত জানালেও সদর দপ্তর এমন স্থানে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ছয়টি ইউনিয়নের মানুষের জন্য সমানভাবে সহজপ্রাপ্য ও প্রশাসনিকভাবে কার্যকর। গণশুনানির সুপারিশ এবং বাস্তব পরিস্থিতি উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। কিন্তু একদিনের মাথায় আজ বুধবার নিকারের সভায় সরকার  নতুন উপজেলার ঘোষণা দেয়।


এ জাতীয় আরো খবর