ঢাকা মহানগর আজ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর,যেখানে প্রতিদিন কয়েক কোটি মানুষের চলাচল নির্ভর করে একটি সীমিত ও চাপপূর্ণ সড়ক নেটওয়ার্কের ওপর। এই চাপের সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে। প্রতিদিনের দুর্ঘটনা, প্রাণহানি, যানজট ও বিশৃঙ্খলা-সব মিলিয়ে ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনা এখন একটি বড় জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির চিত্রঃ
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী,দেশে প্রতি মাসেই শত শত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে, যার বড় একটি অংশ ঘটে ঢাকা মহানগর ও আশপাশ এলাকায়। বিশেষ করে মার্চ মাসে ৬০০-এর বেশি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু এবং হাজারের বেশি আহত হওয়ার ঘটনা সামগ্রিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে কয়েকটি গুরুতর দুর্ঘটনা ঘটছে,যার অধিকাংশই মোটরসাইকেল,বাস ও দ্রুতগতির (ব্যাটারী চালিত রিকসা ও অটো) ছোট যানবাহনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ঢাকা শহরের সড়কগুলোতে একই সঙ্গে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, রিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেল ও পথচারীদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল সড়ক নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বিশেষ করে পিক আওয়ারে যানবাহনের চাপ, ট্রাফিক নিয়ম না মানা এবং রাস্তার অপরিকল্পিত ব্যবহার দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
দুর্ঘটনার প্রধান কারণসমূহঃ
ঢাকার সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে বেশ কিছু কাঠামোগত ও আচরণগত কারণ রয়েছে-
প্রথমতঃ অদক্ষ চালক একটি বড় সমস্যা। অনেক চালক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই লাইসেন্স পান বা অনিয়মের মাধ্যমে গাড়ি চালান। ফলে তারা জরুরি পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হন।
দ্বিতীয়তঃ যানবাহনের ফিটনেস সংকট। ঢাকায় প্রচুর পুরোনো ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল করছে, যা যেকোনো সময় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
তৃতীয়তঃ ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা। লেন না মানা,উল্টোপথে চলা,অবৈধ ব্যাটারীচালিত রিকসা ও অটো,অতিরিক্ত গতি, সিগন্যাল অমান্য করা-এসব নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চতুর্থতঃ পথচারীদের নিরাপত্তাহীনতা। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পথচারীরা বাধ্য হয়ে সড়কে হাঁটেন,যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়।
পঞ্চমতঃ দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের অভাব। ট্রাফিক পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় সমস্যা জটিল হচ্ছে।
ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীঃ
ঢাকার সড়কে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে পথচারী,মোটরসাইকেল আরোহী এবং গণপরিবহনের যাত্রীরা। শিশু ও শিক্ষার্থীরাও উল্লেখযোগ্য হারে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। স্কুল-কলেজের আশপাশে নিরাপদ পারাপারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় এই ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
এছাড়া, ডেলিভারি সার্ভিস ও রাইড শেয়ারিং চালকদের মধ্যে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর চাপ থাকায় তারা প্রায়ই বেপরোয়া হয়ে যান, যা দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাঃ
ঢাকার সড়ক অবকাঠামোও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট নয়। অনেক সড়কে সঠিক লেন মার্কিং নেই, ট্রাফিক সিগন্যাল অকার্যকর, রাস্তার আলো অপর্যাপ্ত এবং ফুটপাত দখল হয়ে আছে। এছাড়া, পর্যাপ্ত ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস না থাকায় পথচারীরা ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হন।
নতুন সড়ক নির্মাণ হলেও অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিরীক্ষা (রোড সেফটি অডিট) করা হয় না, ফলে ত্রুটিপূর্ণ নকশা থেকেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আইন ও বাস্তব প্রয়োগের ফাঁকঃ
বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগে বড় ঘাটতি রয়েছে। জরিমানা বা শাস্তির ভয় অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে না। অনেক সময় প্রভাবশালী মহল বা রাজনৈতিক চাপের কারণে আইন প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ে।
এছাড়া, দুর্ঘটনার পর সঠিক তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতায় ভোগে, ফলে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা কমই দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অবস্থানঃ
বিশ্বের উন্নত শহরগুলো-যেমন সিঙ্গাপুর,লন্ডন বা টোকিও-সড়ক নিরাপত্তায় প্রযুক্তিনির্ভর ও কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সেখানে স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা, স্মার্ট ট্রাফিক সিস্টেম এবং কঠোর লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া দুর্ঘটনা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
অন্যদিকে, ঢাকা এখনো ম্যানুয়াল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, সীমিত প্রযুক্তি ব্যবহার এবং দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যা আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
করণীয় ও সুপারিশঃ
ঢাকার সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন-
প্রথমতঃ চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া কঠোর করতে হবে। ড্রাইভিং স্কুল বাধ্যতামূলক করা এবং পরীক্ষার মান উন্নত করা জরুরি।
দ্বিতীয়তঃ যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করতে ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে অনিয়ম কমে।
তৃতীয়তঃ ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। সিসিটিভি ও স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা চালু করলে আইন ভাঙার প্রবণতা কমবে।
চতুর্থতঃ পথচারীদের জন্য নিরাপদ ফুটপাত,ওভারব্রিজ ও আন্ডারপাস নিশ্চিত করতে হবে। ফুটপাত দখলমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।ফুটওভারব্রীজের যেখানে যেখানে চলন্ত সিঁড়ি আছে সেগুলি চলন্ত অবস্থায় রাখা।
পঞ্চমতঃ গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শৃঙ্খলিত করতে হবে,যাতে ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ কমে।
ষষ্ঠতঃ জনসচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত প্রচারণা চালানো প্রয়োজন।
সপ্তমতঃ একটি শক্তিশালী সড়ক নিরাপত্তা গবেষণা ইউনিট গঠন করে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
ঢাকা মহানগরের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সমস্যা,যার সমাধানে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যবস্থাপনা। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়নই হতে পারে দুর্ঘটনা কমানোর মূল চাবিকাঠি।
একটি নিরাপদ ঢাকা গড়ে তুলতে হলে সরকার,আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, চালক, পথচারী-সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,সাবেক মহাসচিব-নিরাপদ সড়ক চাই।
০১৭১৬৪৯৩০৮৯