বাংলাদেশের সড়ক যেন এখন আর যাতায়াতের পথ নয়, বরং অনিশ্চিত জীবনের এক নির্মম পরীক্ষাগার। প্রতিদিন মানুষ ঘর থেকে বের হয়,কিন্তু ফিরবে কি না-সেই নিশ্চয়তা নেই। এই ভয়াবহ বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে মার্চ মাসের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান, যা কেবল সংখ্যা নয়-এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা,নীতিগত দুর্বলতা এবং সামাজিক উদাসীনতার নির্মম দলিল।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মার্চ মাসে দেশে ৬১৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬১৯ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৫৪৮ জন। একই সময়ে রেলপথে ৪৫টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫৪ জনের এবং আহত হয়েছেন ২২৯ জন। নৌপথেও ৯টি দুর্ঘটনায় নিহত ৯ জন, আহত ১৯ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৩ জন। সব মিলিয়ে সড়ক, রেল ও নৌপথে মোট ৬৭০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৬৮২ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৭৯৬ জন। এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়-প্রতিটি সংখ্যা একটি পরিবার ধ্বংসের গল্প, একটি ভবিষ্যৎ নিভে যাওয়ার ইতিহাস।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ২২২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৩৭ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ, সড়কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন হিসেবে মোটরসাইকেল এখন মৃত্যুর বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা-১৬০টি ঘটনায় ১৭০ জন নিহত—যা প্রমাণ করে রাজধানীকেন্দ্রিক সড়ক ব্যবস্থার অস্থিরতা কতটা গভীর।
প্রশ্ন হচ্ছে,কেন এই অবস্থা? কেন বাংলাদেশের সড়কগুলো এত প্রাণঘাতী? এর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার দুর্বলতা। উন্নত দেশগুলোতে সড়ক নির্মাণের আগে বিস্তৃত গবেষণা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং নিরাপত্তা নিরীক্ষা করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অনেক সড়ক নির্মাণ হয় তাড়াহুড়ো করে, যেখানে নিরাপত্তার চেয়ে প্রকল্প শেষ করাই হয়ে ওঠে মূল লক্ষ্য। ফলে সড়কে থাকে না পর্যাপ্ত ডিভাইডার, সাইনেজ, আলোকসজ্জা বা নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো আইন প্রয়োগের দুর্বলতা। ট্রাফিক আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই-এই বাস্তবতা এখন প্রায় স্বীকৃত সত্য। উল্টো পথে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত গতি, লাইসেন্সবিহীন চালক-এসব যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থিতি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয় না, কখনো আবার দুর্নীতি বা প্রভাবের কারণে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।
তৃতীয়ত,পরিবহন খাতের অরাজকতা। মালিক-শ্রমিক সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, প্রতিযোগিতামূলক বেপরোয়া চালনা এবং যাত্রী ওঠানামার বিশৃঙ্খলা সড়ককে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে বাস স্টপেজ নির্ধারিত, সময়সূচি কঠোরভাবে মানা হয়, সেখানে বাংলাদেশে যাত্রী তুলতে গিয়ে যেকোনো জায়গায় থামা বা হঠাৎ লেন পরিবর্তন করা সাধারণ ঘটনা।
চতুর্থত, চালকদের দক্ষতার অভাব। অনেক চালক পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ছাড়াই সড়কে নামছেন। দীর্ঘসময় ধরে গাড়ি চালানো, ক্লান্তি, মাদকাসক্তি-এসব বিষয়ও দুর্ঘটনার বড় কারণ। উন্নত দেশগুলোতে চালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা বাংলাদেশে এখনো কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
পঞ্চমত, যানবাহনের ফিটনেস সংকট। ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়কে চলাচল করছে নির্বিঘ্নে। ব্রেক, লাইট, টায়ার-সবকিছুতেই ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও এসব যানবাহন সড়কে নামছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বহুগুণে।
ষষ্ঠত, জনসচেতনতার অভাব। পথচারীরা ফুটপাত ব্যবহার না করে সড়কে হাঁটেন, যেখানে-সেখানে রাস্তা পার হন। আবার যাত্রীরা ঝুঁকি জেনেও বাসের ছাদে বা অতিরিক্ত ভিড়ে যাতায়াত করেন। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে শুধু আইন দিয়ে দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য। অনেক সময় দেখা যায়, দুর্ঘটনার পর দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা বা অসংবেদনশীল মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বাস্তবতা স্বীকার না করে দায় অন্যের ওপর চাপানো বা ঘটনাকে ছোট করে দেখা-এসব আচরণ জনগণের আস্থা কমিয়ে দেয় এবং সমস্যার সমাধানকে বিলম্বিত করে।
এখন প্রশ্ন, সমাধান কোথায়? কীভাবে এই মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব?
প্রথমত, একটি শক্তিশালী ও আধুনিক সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন জরুরি। বিদ্যমান আইন থাকলেও তার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো, লাইসেন্স বাতিল, এমনকি কারাদণ্ড-এসব ব্যবস্থা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। সিসিটিভি,স্পিড ক্যামেরা,অটোমেটেড ফাইন সিস্টেম-এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে আইন ভঙ্গকারীদের দ্রুত শনাক্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।
তৃতীয়ত, সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রতিটি সড়কে নিরাপত্তা নিরীক্ষা(সেফটি অডিট) বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো দ্রুত সংস্কার করতে হবে।
চতুর্থত, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের প্রশিক্ষণ ছাড়া লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
পঞ্চমত,গণপরিবহন খাতে সংস্কার আনতে হবে। আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক, নির্দিষ্ট রুট ও সময়সূচি চালু করতে হবে।
ষষ্ঠত, জনসচেতনতা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে গণমাধ্যম-সবখানে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
সবশেষে,রাজনৈতিক সদিচ্ছা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যদি সরকার সত্যিই চায়,তাহলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন কঠোর সিদ্ধান্ত, জবাবদিহিতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ।
মার্চের এই পরিসংখ্যান শুধু একটি মাসের হিসাব নয়-এটি একটি সতর্কবার্তা। এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে এই সংখ্যা আরও বাড়বে, আরও পরিবার নিঃস্ব হবে। সড়ককে নিরাপদ করা এখন আর বিকল্প নয়, এটি রাষ্ট্রের জন্য এক জরুরি দায়িত্ব।
লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,সাবেক মহাসচিব-নিরাপদ সড়ক চাই।
০১৭১৬৪৯৩০৮৯