শনিবার, মার্চ ৭, ২০২৬

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস-অনুভূতির রঙে বদলে যাওয়া এক দিন

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০২-১৪ ১০:৩৯:৩২

১৪ ফেব্রুয়ারি এলেই শহরের রাস্তায় বদলে যায় দৃশ্যপট। ফুলের দোকানে লাল গোলাপের ভিড়, অনলাইন শপে বিশেষ অফার, ক্যাফেগুলোতে আগে থেকেই টেবিল বুকিং-সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবহ। বিশ্ব ভালোবাসা দিবস এখন আর শুধু তরুণ-তরুণীর আবেগের দিন নয়; এটি হয়ে উঠেছে সম্পর্ক, প্রকাশ ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার এক সামাজিক উৎসব।

ভালোবাসা দিবসের শিকড় পাশ্চাত্যে হলেও বিশ্বায়নের যুগে এটি বাংলাদেশের শহর-গ্রাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তবে এ দিনের উদযাপন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তবধর্মী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখুঁত ছবির ভিড় থাকলেও বাস্তবে মানুষ খুঁজছে আন্তরিকতা। ফুল বা উপহারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সময় দেওয়া,কথা শোনা,পাশে থাকা।
ঢাকার এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রিমা ও তার স্বামী সাদমানের গল্পও এমন। দুজনেই ব্যস্ত চাকরিজীবী। তারা জানান, ভালোবাসা দিবসে বড় কোনো আয়োজন নয়, বরং সন্ধ্যায় একসঙ্গে রান্না করা ও ছাদের উপর চা খাওয়াই তাদের বিশেষ মুহূর্ত। 'ভালোবাসা মানে প্রতিদিনের যত্ন,' বলেন রিমা। এই উপলব্ধিই এখন অনেক দম্পতির কাছে মুখ্য হয়ে উঠছে।
এদিকে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভালোবাসা দিবস মানে নতুনভাবে সম্পর্কের সংজ্ঞা খোঁজা। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থী তন্ময় জানায়, 'এটা শুধু প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য নয়। আমি এদিন মাকে ফুল দিই,বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাই।' সম্পর্কের বহুমাত্রিকতা আজকের প্রজন্মকে আরও খোলামেলা ও সংবেদনশীল করে তুলছে।
তবে ভালোবাসা দিবসকে ঘিরে বাণিজ্যিকীকরণের অভিযোগও রয়েছে। রেস্টুরেন্টের বিশেষ প্যাকেজ, উপহারের বাড়তি দাম-সব মিলিয়ে অনেকের কাছে দিনটি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই দিন ঘিরে বিপুল লেনদেন স্থানীয় ব্যবসায় ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপও তৈরি করে। তাই অনেকে এখন সাদামাটা উদযাপনকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন।
সামাজিক বাস্তবতায় ভালোবাসা দিবস আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়-সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মান। ভিন্নমত, ভিন্ন সংস্কৃতি কিংবা ভিন্ন জীবনধারার মানুষদের প্রতিও সহমর্মিতা প্রকাশের দিন হতে পারে এটি। অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এদিন বৃদ্ধাশ্রম, পথশিশু আশ্রয়কেন্দ্র বা হাসপাতালে গিয়ে সময় দেন। ভালোবাসার পরিধি এভাবেই ব্যক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক দায়িত্বে রূপ নেয়।
ডিজিটাল যুগে ভালোবাসার ভাষাও বদলেছে। অনলাইন কার্ড, ভিডিও বার্তা, ভার্চুয়াল উপহার-সবই এখন স্বাভাবিক। দূরত্ব আর বাধা নয়; প্রবাসে থাকা প্রিয়জনও ভিডিও কলে অংশ নেয় উদযাপনে। প্রযুক্তি ভালোবাসাকে আরও সহজলভ্য করেছে, তবে একই সঙ্গে তাৎক্ষণিকতার চাপও তৈরি করেছে। সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে এখন প্রয়োজন বেশি সচেতনতা ও ধৈর্য।
বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই-ভালোবাসা কোনো একদিনের আবেগ নয়, এটি একটি চর্চা। সম্পর্কের মধ্যে সমতা, শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস গড়ে তোলাই প্রকৃত উদযাপন। ফুল শুকিয়ে যায়, পোস্টের রিচ কমে যায়, কিন্তু আন্তরিকতার স্মৃতি থেকে যায় দীর্ঘদিন।
এই দিনে হয়তো লাল রঙের আধিক্য চোখে পড়ে, কিন্তু ভালোবাসার রঙ আসলে বহুবর্ণ। কখনো তা বন্ধুত্ব, কখনো পারিবারিক মমতা, কখনো মানবিক দায়বদ্ধতা। তাই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস শুধু একটি তারিখ নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ভালোবাসা প্রকাশ করতে দ্বিধা নয়, সাহস প্রয়োজন। আর সেই সাহসই একটি সমাজকে করে তোলে আরও মানবিক, আরও উজ্জ্বল।


এ জাতীয় আরো খবর