মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১৬, ২০২৫

উচ্চ ভবন নির্মাণে বেস আইসোলেশন,বোম শেল্টার ও ভূমিকম্প-সতর্কতা: আমাদের বাঁচার পথ

  • জাহাঙ্গীর বাবু
  • ২০২৫-১১-২৫ ০৯:১৩:৫২

সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ৫.৭ মাত্রার কম্পনে যেভাবে বহু ভবন ফাটল ধরেছে, কিছু ভবন হেলে পড়েছে এবং ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে—তা আমাদের নির্মাণশৈলী নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে। আমরা কি সত্যিই প্রস্তুত? নাকি কাগজে-কলমে নিরাপত্তা থাকলেও বাস্তবে আমরা এখনো ঝুঁকির মধ্যে বাস করছি?
এ মুহূর্তে বিষয়গুলো নতুন করে ভাবা জরুরি। শুধু ভাবা নয়—বাস্তব উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

বেস আইসোলেশন: ভূমিকম্প–নিরাপত্তার বিপ্লব
২০১১ সালের জাপানের ৯.১ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল। সেই ভয়াবহ কম্পনে দেখা যায়, টোকিওর রাস্তায় গাড়ি চলেছে, হাসপাতালগুলোতে অপারেশন বন্ধ হয়নি, আর বেস আইসোলেশনযুক্ত ভবনগুলোর ভেতরে কাচের গ্লাসও ভাঙেনি।

কিন্তু বেস আইসোলেশন আসলে কী?
সহজ ভাষায়: ভবনের নিচে বসানো “শক–অ্যাবজরবার”
বিল্ডিংকে মাটির সাথে শক্ত করে বেঁধে না রেখে নিচে বসানো হয় শত শত বিশেষ রাবার–লেড বেয়ারিং।
এগুলো—ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি শোষণ করে,মাটির তীব্র দুলুনিকে ৫০–৮০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়,উপরের ভবনকে ধীরে দোলার সুযোগ দেয়,ফলে ভবনের স্ট্রাকচার কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়,আসবাব, যন্ত্রপাতি ও ভেতরের মানুষ নিরাপদ থাকে,যতো বড় ভূমিকম্প—ততো বেশি পার্থক্য তৈরি করে এই প্রযুক্তি।

রাবার–লেড বেয়ারিং কীভাবে কাজ করে?
রাবার–বিয়ারিং সাধারণত তিনটি স্তরে কাজ করে—

১) নিচের প্লেট: ফাউন্ডেশনের সাথে যুক্ত

২) রাবারের স্তর: নমনীয়, দুলুনি শোষণ করে

৩) লেড কোর (Lead Core): শক্ত লেড ধাতু যা শক্তি শোষণ করে (energy dissipation)
এগুলো মিলেই একটি ভবনকে এমনভাবে দাঁড় করায়, যেন ভূমিকম্পের সময় ভবনটা “বাঁচার সুযোগ” পায়।

বিশ্বে এখন বাধ্যতামূলক—বাংলাদেশেও শুরু
জাপানের মতো ভূমিকম্প–প্রবণ দেশে এই সিস্টেম আজ বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশেও BNBC–2020 অনুযায়ী উচ্চ গুরুত্বসম্পন্ন ভবনে বেস আইসোলেশন ব্যবহারের নির্দেশনা যুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে—রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে,মেট্রোরেলের কিছু স্টেশনে,নতুন কিছু টাওয়ারে,এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু হয়েছে।
এটা কোনো বিলাসিতা নয়—এটা ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রথম শর্ত।

বোম শেল্টার: জীবনরক্ষাকারী বাস্তব সমাধান
ভূমিকম্প বা বিস্ফোরণ—দুটি বিপদই আমাদের শহরে অত্যন্ত বাস্তব।
সিঙ্গাপুর, জাপান, ইসরায়েল, সুইডেন—সব উন্নত দেশেই আবাসিক ইউনিট, হাসপাতাল, ডেটা সেন্টার, এমনকি স্কুলেও বোম শেল্টার বাধ্যতামূলক।
আমি নিজে সিঙ্গাপুরে ৪১টি বোম শেল্টার নির্মাণ করেছি। অভিজ্ঞতা বলছে—
এগুলো ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে না,পড়লেও এই শেল্টার ঘরটি অক্ষত থাকে,বিস্ফোরণের শক–ওয়েভ প্রতিরোধ করে
জরুরি মুহূর্তে ২০–২৫ মিনিটে শত মানুষকে জীবন বাঁচানোর সুযোগ দেয়
বাংলাদেশে আইনগতভাবে এটি বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এটি সময়ের দাবি।
তাৎক্ষণিক করণীয়: যেগুলো এখনই করা উচিত
ভূমিকম্পের সময়
বক্স খাট বাদ দিয়ে চার পা–ওয়ালা চৌকি ব্যবহার,খাট বা শক্ত টেবিলের নিচে আশ্রয়,মাথায় প্লাস্টিকের বালতি/ঝুড়ি,
লিফট নয়,সিঁড়িতে যাওয়া যাবে না,খোলা জায়গায় সরে যাওয়া
Drop–Cover–Hold
গ্যাস ও বিদ্যুতের মেইন সুইচ বন্ধ করা

 পূর্ব প্রস্তুতি
Go–Bag (১ দিনের জরুরি ব্যাগ)
পানি,টর্চ,পাওয়ার ব্যাংক,প্রয়োজনীয় ওষুধ,কাগজপত্রের কপি

বাংলাদেশে নির্মাণশৈলীর সমস্যা: কেন বিপদ বাড়ছে?
বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা তিনটি—

১. ইঞ্জিনিয়ার ছাড়া ভবন ডিজাইন
অনেকেই মনে করেন মিস্ত্রি দিয়ে বাড়ি বানানো যায়।
এটা ভুল—এটা আত্মঘাতী।
ভূমিকম্পের লোড ক্যালকুলেশন, টাই-বোম, শিয়ার ওয়াল, কলাম–বিম রেশিও—এসব কোনো মিস্ত্রি বোঝেন না।

২. নিম্নমানের সামগ্রী
রডে কার্বন মিশ্রণ, সিমেন্টে মানহীনতা—সবই ভবনের জীবন কমায়।

৩. BNBC–2020 মানা হয় না
যা বাধ্যতামূলক—তা-ই অনেক জায়গায় অমান্য।

ফলে একটি শহর ধীরে ধীরে “টাইম বোমা” হয়ে ওঠে।

ভূমিকম্প ঝুঁকি জোন (BNBC–2020)
Zone 1 – Low Risk:
সাতক্ষীরা, বরগুনা

Zone 2 – Moderate Risk:
ঢাকা, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর

 Zone 3 – Severe Risk:
চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, ময়মনসিংহ

 Zone 4 – Very Severe Risk:
সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ — সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল

যত ঝুঁকি বেশি, তত কঠোর প্রযুক্তি দরকার।
অতিরিক্ত করণীয়: যা এখনই সরকার–বেসরকারি উভয়ের করা উচিত
সব নতুন ভবনে বোম শেল্টার বাধ্যতামূলক
গুরুত্বপূর্ণ ভবনে বেস আইসোলেশন ব্যবহার
পুরোনো ভবনের স্ট্রাকচারাল অডিট
স্কুল–অফিসে নিয়মিত Earthquake Drill
ডিজাইনে শিয়ার ওয়াল, ডায়াফ্রাম, টাই–বোম নিশ্চিতকরণ
নির্মাণ শ্রমিকদের উন্নত প্রশিক্ষণ
প্রকৌশলীদের লাইসেন্স যাচাই কঠোর করা

শেষ কথা: সাবধানতা মানুষের দায়িত্ব
“জন্ম–মৃত্যু আল্লাহর হাতে, কিন্তু সাবধানতা মানুষের দায়িত্ব।
ভূমিকম্প কখন আসবে কেউ জানে না,
কিন্তু প্রস্তুত থাকলে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।”

জাপান দেখিয়েছে—
ভূমিকম্পের দেশেও নিরাপদে বসবাস করা যায়,
যদি প্রযুক্তি, জ্ঞান ও সতর্কতা একসাথে থাকে।

এখন সময়—
আমাদের শেখার, প্রস্তুত হওয়ার,
আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি নিরাপদ বাসস্থান  উপহার দেওয়ার।


এ জাতীয় আরো খবর