ধু-ধু এক বালুচর।
দিগন্তজোড়া শূন্যতা, বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো কোলাহল নেই।
সুচিস্মিতা হাঁটছে একা, পায়ের ছাপ পড়ে থাকছে পেছনে,
কিন্তু সেগুলোকেও ধীরে ধীরে মুছে দিচ্ছে হাওয়ার ঝাপটা।
তার পরনে ছাই চাপা রং এর শাড়ি চোখে অদ্ভুত এক জেদ।
কাঁধে একটি ছেঁড়া ব্যাগ — তাতে শুধু কয়েকটা বই,
একটি পুরনো ডায়েরি, আর একটা ছোট কাঠের বাক্স —
যা সে কখনো খুলে দেখে না, তবু সঙ্গে রাখে সবসময়।
সাগর কাছে। জোয়ার উঠেছে।
সে দাঁড়িয়ে দেখে ঢেউয়ের আনাগোনা।
পেছনে জীবন ছুটে গেছে অনেক আগেই,
একটা দরজা বন্ধ হয়েছে চিরতরে।
সুবিমল আর নেই।
তিন বছর আগে এক সকালে সে বলেছিল —
“তুমি পারবে সুচি, আমি জানি। শুধু থেমো না, কখনো থেমো না।”
তারপর এক ভোরে সে চলে গেল — এক দুঃসহ রোগের কবলে পড়ে।
সুচিস্মিতা চুপচাপ ছিল, চিৎকার করেনি।
কারণ সে জানত, চিৎকারে সাগর থামে না।
দীপায়ন তখন মাত্র পাঁচ বছরের।
বাবার মুখটা ভালোমতো মনে রাখুক বলে সে
প্রতিদিন ছেলেকে নিয়ে বসত সুবিমলের ছবি নিয়ে,
গল্প করত তার স্বপ্নের, তার অসমাপ্ত কবিতার।
আজ দীপায়নও নেই।
আট মাস আগে এক দূর্ঘটনায় সে হারিয়ে গেছে —
স্কুলবাস উল্টে যায় কোনো এক বৃষ্টির সকালে।
সুচিস্মিতা জানত না কীভাবে বাঁচা যায় এরপর।
তবু সেদিন, সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলেছিল —
“সব হারালেও, হারি না। আমি রইলাম।”
তারপর থেকে প্রতিদিন হাঁটে —ত
হাঁটে, না-জানা পথ ধরে, শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে,
পাহাড়ের বুক, গ্রামের মেঠোপথ,
নদীর ঘাট — প্রতিটি পথ তার কাছে নতুন জন্ম।
সে লিখে যায় ডায়েরিতে —
প্রতিদিনের পথচলার কথা,
প্রতিদিনের শূন্যতার পাশে গজিয়ে ওঠা নতুন সাহসের কথা।
একদিন সন্ধেবেলা সে এক ছোট লাইব্রেরিতে গিয়ে বসে —
ছোট্ট মেয়েটি, লাইব্রেরিয়ান, তাকে দেখে বলল,
“দিদিভাই, আপনি এত ঘুরে বেড়ান কেন?”
সে বলেছিল, “কারণ থেমে গেলে, সব শেষ হয়ে যায়।
আমি চাই না শেষ হোক।”
বছর ঘুরে গেছে।
এখন সে বই লেখে — নিজের যাত্রার কথা,
একজন ‘হারানো মা’-র চোখ দিয়ে দেখা জীবনের মানে।
তার বইয়ের নাম: “জন্ম এক অভিযাত্রা”।
লেখার শেষে সে লিখে রেখেছে —
“আমার ডানা ছেঁড়া ছিল,
তাই আমি শিখে নিয়েছিলাম—
কীভাবে আগুন হয়ে উড়তে হয়।”
বই উৎসর্গ করা হয়েছে —
সুবিমল ও দীপায়নের নামে।
সুচিস্মিতা আবার হাঁটছে।
নতুন পথে, নতুন কোনো শহরে।
হয়তো কেউ তাকে চিনবে না,
তবু সে জানে—
পেছনে ফেলে যাওয়া প্রতিটি ছাপ
একটা সাহসের মানচিত্র হয়ে থেকে যাবে
কারও না কারও ভিতরে।