ইরানের কট্টরপন্থী রাজনীতিক মোহাম্মদ-হোসেইন সাফফার-হারান্দির সাম্প্রতিক মন্তব্য দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, রাশিয়া আগেই ইসরায়েলের কাছ থেকে জেনেছিল—ইরান সরকারের পতনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। হারান্দির এই বক্তব্যে ইরান-রাশিয়া সম্পর্কের ওপর আস্থার ঘাটতি আবারও সামনে এসেছে।
হারান্দি, যিনি ইরানের এক্সপিডিয়েন্সি কাউন্সিলের সদস্য, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন-গত জুনে ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যে ১২ দিনের সামরিক অভিযান চালিয়েছিল, তা ছিল একটি পরিকল্পিত সরকার পতনের কৌশল। তার ভাষ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর দুই-তিন দিন আগেই ইসরায়েলের কিছু প্রতিনিধি রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ পরিকল্পনার কথা জানায় এবং মস্কোকে তেহরান থেকে সরে যেতে বলে।
তবে এই তথ্যের উৎস বা রাশিয়ার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে হারান্দি কিছু জানাননি। ফলে তাঁর বক্তব্য ঘিরে নানা প্রশ্ন উঠেছে ইরানি সমাজে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের খবরে বলা হয়েছে, হারান্দির বক্তব্য ইরানে রাশিয়ার ভূমিকাকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ বাড়িয়ে তুলেছে। দেশটির বিশিষ্ট সাংবাদিক ও আইনজীবী এসফান্দিয়ার জোলগাদর মন্তব্য করেছেন, ‘‘রাশিয়া যদি সত্যিই আগেভাগেই জানত, তাহলে তারা ইরানকে সতর্ক করেনি কেন?’’
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত মস্কো ইসরায়েল কিংবা পশ্চিমাদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়াতে চায়নি। যুদ্ধের সময় রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ ছিল কেবল কূটনৈতিক বিবৃতিতে। মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছিলেন-রাশিয়া ইরান ও ইসরায়েলের সংঘর্ষে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করছে, তবে তিনি কোনো সামরিক সহায়তা নয়, বরং জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থার সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের একটি ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সম্পর্কের ভাঙন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকরা বলছেন-রাশিয়া বহু প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করেনি। এস-৪০০ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সু-৩৫ যুদ্ধবিমান-এসব নিয়ে প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব সহায়তা খুব সীমিত ছিল। এসব বিলম্ব ও অপূর্ণতা ইরানিদের মধ্যে রাশিয়ার প্রতি আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
আইআরজিসি (ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড)–এর রাজনৈতিক ডেপুটি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদোল্লাহ জাভানি মন্তব্য করেছেন, ‘‘রাশিয়া ও চীনের নীরবতা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে।’’
সাবেক ইরানি রাষ্ট্রদূত নেমাতোল্লাহ ইজাদি মনে করেন, যদি রাশিয়াকে কখনো ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে বেছে নিতে হয়, তারা ইসরায়েলকেই বেছে নেবে। কারণ, ইরান-পশ্চিম সম্পর্কের টানাপোড়েন রাশিয়ার জন্য কৌশলগতভাবে আরও লাভজনক।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজেও এক বক্তব্যে বলেন-ইসরায়েলে প্রায় ২০ লাখ রুশ ভাষাভাষী বাস করেন, যা দেশটিকে প্রায় ‘রুশভাষী রাষ্ট্র’ করে তুলেছে। এই মন্তব্যও ইরানে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: রাশিয়ার অগ্রাধিকার কী? ইরান, নাকি ইসরায়েল?
ইরানি সংবাদপত্র 'শার্ঘ'-এ এক বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, ‘‘রাশিয়ার এই আচরণ শুধু কূটনৈতিক সতর্কতা নয়, বরং তাদের স্বার্থনির্ভর নীতিরই প্রকাশ।’’
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিম থেকে বিচ্ছিন্ন ইরান দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে নিজেদের আন্তর্জাতিক অবস্থান রক্ষা করতে চেয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোয় স্পষ্ট-মিত্র দেশগুলোও কৌশলগত মুহূর্তে নিজেদের স্বার্থেই চলে। ফলে ইরানের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তারা কাকে কতটুকু বিশ্বাস করবে এবং ভবিষ্যতে বৈশ্বিক কূটনীতিতে কীভাবে নিজেদের অবস্থান রক্ষা করবে।
হারান্দির বক্তব্য হয়তো অনেকেই উড়িয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু তেহরানে রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্ন এখন প্রকট-রাশিয়া কি সত্যিই ইরানের মিত্র, নাকি প্রয়োজনমতো অবস্থান বদলানো সুবিধাবাদী শক্তি?
কীওয়ার্ডস:
ইরান রাশিয়া সম্পর্ক, ইসরায়েল ইরান যুদ্ধ, হারান্দি রাশিয়া মন্তব্য, রাশিয়ার সুবিধাবাদ, ইরান কূটনৈতিক সংকট