চলমান গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চব্বিশে জুলাইয়ের পূর্ববর্তী সময়কালে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহতদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়েছেন-২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আগ পর্যন্ত সময়কালে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের সন্ত্রাসী হামলা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক সংগঠিত হত্যাকাণ্ডগুলোকে চিহ্নিত করে যথাযথ তদন্তে নেওয়ার।
বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় শহীদ বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের পরিবারের সঙ্গে এক বৈঠকে এই ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা। সাক্ষাৎকারে উপস্থিত ছিলেন আবরারের বাবা মোহাম্মদ বরকত উল্লাহ, ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ এবং মামা মোহাম্মদ মোফাজ্জল হোসেন।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানায়, বৈঠকে আবরার ফাহাদের পরিবার বিগত ১৫ বছরে ছাত্রলীগের হাতে প্রাণ হারানো ছাত্র-জনতার ঘটনার পূর্ণ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের দাবি জানান। তারা উল্লেখ করেন, দলীয় পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার চরম বলি হয়েছেন আবরারসহ অসংখ্য তরুণ ও শিক্ষার্থী।
আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, “দেশের স্বার্থে কথা বলার কারণেই আমার ছেলেকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সে অসম পানি বণ্টনের বিরুদ্ধে, জাতীয় স্বার্থে কথা বলেছিল। আজো তার মা প্রতিদিন কাঁদেন। আমরা চাই আর কোনো মায়ের বুক খালি না হোক।”
তিনি আরও অনুরোধ করেন, কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর ওপর দীর্ঘদিনের দাবিকৃত সেতু নির্মাণে অন্তর্বর্তী সরকার যেন দ্রুত উদ্যোগ নেয়, যাতে অন্তত ৩০ হাজার মানুষের যাতায়াত দুর্ভোগ লাঘব হয়।
আবরারের ছোট ভাই আবরার ফাইয়াজ শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। বুয়েটের তৃতীয় বর্ষের এই শিক্ষার্থী বলেন, “আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী বান্ধব নয়। প্রয়োজনীয় ল্যাব, সরঞ্জাম, আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাব প্রকট। পাশাপাশি, বুয়েটসহ দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং ও নিপীড়ন বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।”
ফাইয়াজের বক্তব্যে উঠে আসে বুয়েটের অতীত ইতিহাস, যেখানে র্যাগিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন সময় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার হয়নি।
প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “আবরার ফাহাদের মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা ছিল জাতির বিবেকের ওপর একটি বড় আঘাত। আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করবো। পাশাপাশি, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আগ পর্যন্ত সময়কালে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে নিহত ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ জনগণের নামের তালিকা তৈরি করে সবগুলো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করা হবে।”
তিনি আরও জানান, “যে সব ঘটনায় তৎকালীন সরকারের নির্দেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহার করে দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো নিয়েও তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।”
আন্দোলনের মুখে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বারবার আশ্বস্ত করে বলেছে, ২৪ জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান শুধু সরকারের রূপান্তরের সূচনাবিন্দু নয়, এটি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামোর রূপায়ণের দিকেও অগ্রসর হবে। এই পটভূমিতে নিহতদের স্মরণ ও বিচার প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগকে অনেকেই ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।