কবি শামসুল ইসলাম ( ভাইছা )
জন্ম ; ১৭ মার্চ ১৯৪২ খৃস্টাব্দ
মৃত্যু ; ২৭ জুন ২০০৭ খৃস্টাব্দ
ষাট দশকের অন্যতম প্রধান এই কবি কে কোন ক্রমেই ভুলে যাওয়া সম্ভব না-তাঁর বহুবিধ এবং স্বতন্ত্রবোধের জন্য ।
নিভৃতচারী কবি শামসুল ইসলাম কখনোই আলচনায় আসতে চান নি। তিনি তাঁর মত করে সাহিত্য সাধনা করে গেছেন । তাঁর সাহিত্য রচনায় বিশেষ করে কবিতা ও ছড়ায় এমনসব শব্দ প্রয়োগ করেছেন যা তাঁর সমসাময়িক কোন কবির কবিতায় আমরা দেখিনি। শব্দগুলো যেমন বৈচিত্র্যময় তেমনি সেসব শব্দের আভিধানিক অর্থও খুব তাৎপর্যময়। যেমন- তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম “ জলৌকা হে নীল যমুনা “ (১৯৭৫), কি সুন্দর নাম। অর্থটা আরও হৃদয়গ্রাহী । জলৌকা শব্দের অর্থ “জোক”, নির্মম জোকের হৃদয়হীন শোষণকে তিনি যুদ্ধ উত্তর বাংলাদেশের সমূহ বিনষ্টের প্রতীকি হিসেবে ব্যবহার করেছেন ।
তাঁর আরও কিছু কাব্যগ্রন্থের নাম- “ কালনেমিকাল”, “নষ্টা চন্দ্রার চাঁদ “, “কনে সুন্দরী আলো”, “চির বিরিঞ্চির তরু”, “লোহল নুলিয়া”, “হিছাইকার ও অন্যান্য পদ্য”-প্রভৃতি । কাব্যগ্রন্থের নামকরণই তাঁকে আলাদা ধাঁচের কবি হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে। এখানে তাঁর দু-চারটি কাব্যগ্রন্থের সংক্ষিপ্ত আলোচনার লোভ সংবরণ করতে পারছি না-
কালনেমিকালঃ কালনেমি হচ্ছে রাক্ষসরাজ রাবণের মামা , যে যুদ্ধ জয় ছাড়াই মনে
মনে লঙ্কা ভাগ করেছিলো । রাক্ষসরাজ তাকে যে কাজ দিয়েছিলো তা
সমাধার আগেই লঙ্কার কোন অর্ধেক তার হবে তা স্থির করে ফেলেছিল ,
কিন্তু কালনেমির সে বাসনা পূর্ণ হয়নি। রামায়ণের সেই কালনেমিকে
কবি শামসুল ইসলাম প্রতীকি ব্যঞ্জনায় বর্তমান যুগ ও জীবনের
সীমাহীন অপ্রাপ্তি ও অতলান্ত বিড়ম্বনার চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছেন এ নামকরণের মাধ্যমে ।
চির বিরিঞ্চির তরুঃ বিরিঞ্চি শব্দের অর্থ ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু , শিব । আর চির অর্থ অনন্তকাল,তরু অর্থ বৃক্ষ । অতএব পুরো অর্থ দাড়ায় নিত্য ব্রক্ষ্মার বৃক্ষ ।
লোহল নুলিয়া ; এখানে লোহল শব্দের অর্থ লোভী, লোলুপ ইত্যাদি। আর নুলিয়া শব্দের অর্থ হলো পুরী’র সমুদ্র তীরে বসবাসরত মৎস্যজীবী জাতি বিশেষ- যারা সমুদ্র স্নানার্থীদের সহায়তা করে থাকে। এখানে পুরো অর্থ দাড়ায় ললুপ ধীবর বা লোভী জালিক।
হিচহাইকারঃ এই শব্দটির অর্থ হচ্ছে বিনা টিকেটে মোটর বা লরীতে ভ্রমণকারী অর্থাৎ উড়নচণ্ডী যাত্রী । কবি চালচুলোহীন ভবঘুরে বাউন্ডুলে অর্থে শব্দটি প্রয়োগ করেছেন ।
শব্দ প্রয়োগ কবি শামসুল ইসলাম সহজে আয়ত্তে আনতে পেরেছিলেন । সঠিক জায়গায় ব্যবহার করেও দেখিয়েছেন । তাঁর সমসাময়িক আর কোন কবি সাহিত্যিক এমন ব্যঞ্জনাময় শব্দ ব্যবহার করেছেন কিনা মনে পড়েনা ।
এতবড় মাপের কবি তিনি অথচ কখনোই তাঁর মনে কোন অহংকারবোধ কাজ করতে দেখিনি। কারো সাথে খারাপ ব্যবহার, কটুকথা বলেছেন বলে শুনিনি। তাঁর আচার আচরন, আন্তরিকতা এতটা আপন করে নেয়ার মত ছিলো যে একবার তাঁর সান্ন্যিধ্যে যিনি এসেছেন –তিনি কবি শামসুল ইসলামকে ভুলতে পারবেন না। তিনি কখনোই ব্যক্তি স্বর্থের জন্য কারও সাথে দ্বন্দ্বে জড়ান নি । কারও নিন্দা করেন নি ।
৬৫ বছর বয়সে ২০০৭ সালে তিনি এ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। মৃত্যুর কয়েকমাস আগে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্যপদক পান। আজ তাঁর ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর সকল বন্ধু, শুভান্যুধ্যায়ী ও অসংখ্য ভক্তের কাছে নিবেদন এই নিভৃতচারী মানুষটির আত্মার শান্তি কামনা ।