পবিত্র কাবাঘর এবারও নতুন গিলাফে মোড়ানো হবে হিজরি ১৪৪৭ সনের প্রথম প্রহরে। ইসলামিক বর্ষপঞ্জির নববর্ষের রাত, অর্থাৎ ১ মহররম ১৪৪৭ হিজরির রাতেই (বাংলাদেশ সময় ২৫ জুন এশার পর) এই পবিত্র অনুষ্টান অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে একটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় রীতি আবারও নতুন প্রজন্মের সামনে জেগে উঠবে।
সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের পক্ষ থেকে গত ৮ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন গিলাফ হস্তান্তর করা হয়। মক্কা অঞ্চলের ডেপুটি গভর্নর এবং কেন্দ্রীয় হজ কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান প্রিন্স সৌদ বিন মিশাল বিন আবদুল আজিজ এ দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কাবাঘরের ঐতিহ্যবাহী চাবিধারী পরিবারের প্রতিনিধির হাতে নতুন গিলাফ বুঝিয়ে দেন, যা ঐতিহাসিকভাবে এই পরিবারের দায়িত্বে রয়েছে।
হিজরি নববর্ষের রাতে এশার নামাজের পর শুরু হবে গিলাফ পরিবর্তনের কাজ। এতে অংশ নেবেন ১৫৯ জন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কারিগর, যাদের অনেকেই বছরের পর বছর ধরে এই কাজে যুক্ত। ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর এ কাজ সম্পূর্ণ করা হবে গভীর শ্রদ্ধা ও নিয়মানুবর্তিতার মাধ্যমে।
ইতিহাস অনুযায়ী, প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে জিলহজ মাসের ৯ তারিখ-আরাফাত দিবসে-কাবার গিলাফ পরিবর্তন করা হতো। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে এই সময়সূচি পরিবর্তন করে হিজরি নববর্ষের রাতেই গিলাফ পরিবর্তনের রীতি চালু করে সৌদি সরকার। এই নতুন ধারা ইসলামী ক্যালেন্ডারের সূচনা দিনটিকে আরও তাৎপর্যময় করে তুলেছে।
কাবার গিলাফ শুধু একটি ধর্মীয় প্রতীক নয়-এটি এক অপূর্ব কারুশিল্পের নিদর্শনও।
পুরো গিলাফের আয়তন ৬৫৮ বর্গমিটার
এতে ব্যবহৃত হয়েছে ৬৭০ কেজি কালো রেশম, ১২০ কেজি ২১ ক্যারেট স্বর্ণ, ও ১০০ কেজি রুপার সুতা
গিলাফে খোদাই করা হয় আল্লাহর ৯৯ নাম ও পবিত্র কোরআনের আয়াত
প্রায় ৮৫০ কেজি ওজনের এই গিলাফ সেলাই করা হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেলাই মেশিনে, যার দৈর্ঘ্য ১৬ মিটার
এটি তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় ছয় থেকে আট মাস
পুরো গিলাফ তৈরির ব্যয় ২৫ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছয় মিলিয়ন মার্কিন ডলার
গিলাফের কাপড় চারটি প্রধান অংশে বিভক্ত থাকে এবং প্রতিটি অংশ বিশেষ পদ্ধতিতে কাবার গায়ে বসানো হয়। গিলাফের নিচের অংশে তামার রিং ব্যবহার করে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হয়। কারুকার্যের বেশ কিছু কাজ এখনও হাতে করা হয়, যাতে ইসলামী সৌন্দর্যবোধ ও আধ্যাত্মিকতা ঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়।
এই গিলাফ কেবল একখণ্ড কাপড় নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শ্রদ্ধা ও ঐতিহ্যের প্রতীক। গিলাফ পরিবর্তনের মুহূর্তটি মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে এক গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধার আবহ তৈরি করে। বিশেষ করে হিজরি নববর্ষের শুরুতে এই অনুষ্টান মুসলিমদের কাছে নতুন আশাবাদ ও প্রার্থনার বার্তা বয়ে আনে।
সংক্ষেপে হাইলাইটস:
২৫ জুন রাতে (১ মহররম, ১৪৪৭ হিজরি) কাবার গিলাফ পরিবর্তনের আনুষ্ঠানিকতা
অংশ নেবেন ১৫৯ জন দক্ষ কারিগর
গিলাফে ব্যবহৃত হয়েছে রেশম, স্বর্ণ ও রুপার সুতা
নতুন রীতি অনুযায়ী হিজরি নববর্ষেই পালিত হচ্ছে এই অনুষ্টান
মোট ব্যয় ২৫ মিলিয়ন সৌদি রিয়াল - বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল ধর্মীয় বস্ত্র
এই গিলাফ পরিবর্তন শুধু একটি আচার নয়, এটি বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলমানের জন্য একটি আবেগময় মুহূর্ত। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় কাবার প্রতি আমাদের ভালোবাসা, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এবং ধর্মীয় দায়িত্ববোধ। হিজরি ১৪৪৭ সন শুরু হোক নতুন গিলাফে মোড়ানো পবিত্র কাবাঘরের বরকত দিয়ে।