শনিবার, মার্চ ৭, ২০২৬

রমজান: কুরআনের মাস,রহমত ও মুক্তির মহাসময়

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০২-২৫ ১১:০২:৪৭

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,'রমজান সেই মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে; যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সুস্পষ্ট পথনির্দেশ ও হক-বাতিলের পার্থক্যকারী।' -কুরআনুল কারিম, সূরা আল-বাকারা ১৮৫।
এই ঘোষণাই রমজানের মর্যাদা নির্ধারণ করে-এটি কেবল একটি চান্দ্র মাস নয়; এটি ওহির আলোয় মানবতার দিকনির্দেশের মাস।

কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সময়
রমজান মূলত কুরআনের মাস। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ এ মাসে জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে কুরআন পুনরাবৃত্তি করতেন। তাই তিলাওয়াত, তাদাব্বুর (ভাবনা-গভীরতা) ও আমলের মাধ্যমে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক নবায়ন করা রমজানের অন্যতম লক্ষ্য। কুরআন মানুষকে শুধু আখিরাতের নয়, দুনিয়ার জীবনেও ন্যায়, সংযম ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়-হক ও বাতিলের সীমারেখা স্পষ্ট করে।

সিয়াম: আত্মসংযমের বিদ্যালয়
রমজানের প্রধান ইবাদত সিয়াম। রোজা কেবল ক্ষুধা-তৃষ্ণা থেকে বিরত থাকা নয়; এটি চোখ, কান, জিহ্বা ও হৃদয়েরও সংযম। আল্লাহ বলেন, 'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।' (সূরা আল-বাকারা ১৮৩)।
তাকওয়া-অর্থাৎ আল্লাহভীতি ও নৈতিক সচেতনতা-রমজানের আসল অর্জন। দিনের দীর্ঘ সময়ে হালাল বিষয় থেকেও বিরত থাকা মানুষকে হারাম থেকে দূরে থাকার শক্তি দেয়।

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা
প্রচলিত হাদিসে রমজানকে তিন দশকে বিভক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে-প্রথম দশক রহমতের, দ্বিতীয় দশক মাগফিরাতের, শেষ দশক জাহান্নাম থেকে মুক্তির। যদিও এ বর্ণনার সনদ নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা আছে, তবে রমজানজুড়ে আল্লাহর করুণা, ক্ষমা ও মুক্তির দুয়ার উন্মুক্ত-এটি সহিহ হাদিসসমূহে সুপ্রতিষ্ঠিত।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, 'যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্ববর্তী গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।' (সহিহ বুখারি,সহিহ মুসলিম)।

লাইলাতুল কদর: হাজার মাসের চেয়ে উত্তম
রমজানের শেষ দশকে রয়েছে লাইলাতুল কদর-যে রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয় এবং ফেরেশতারা অবতরণ করেন শান্তির বার্তা নিয়ে। শেষ দশকে ইতিকাফ, তাহাজ্জুদ, কিয়ামুল লাইল ও দোয়া-ইস্তিগফারের মাধ্যমে এই রাত অন্বেষণ করা সুন্নত।

দান-সদকা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা
রমজান ব্যক্তি ও সমাজ-উভয়ের সংস্কারের মাস। জাকাত, ফিতরা ও নফল সদকার মাধ্যমে দরিদ্র-অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো রমজানের চেতনা। ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে সমাজের বঞ্চিত মানুষের প্রতি সহমর্মিতা জন্মায়। ইফতার করানো, আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করা এবং ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকা-এসবও রমজানের আমল।

আত্মশুদ্ধি থেকে জাতীয় জাগরণ
রমজান কেবল আধ্যাত্মিক অনুশীলন নয়; এটি নৈতিক বিপ্লবের সূচনা। পরিবারে শৃঙ্খলা, কর্মক্ষেত্রে সততা, ব্যবসায় ন্যায্যতা এবং সমাজে ন্যায়বিচার-সবকিছুর ভিত রচিত হয় তাকওয়ার ভিত্তিতে। একজন সংযমী, আল্লাহভীরু মানুষই ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে পারে।
রমজান তাই ক্যালেন্ডারের একটি মাস নয়; এটি আত্মার পুনর্জন্মের সময়। কুরআনের আলোয় নিজেকে গড়ে তোলা, রহমতের ছায়ায় আশ্রয় নেওয়া, মাগফিরাতের আশায় কান্নায় ভেজা দোয়া-আর নাজাতের প্রত্যাশায় সৎপথে অটল থাকা-এই হোক আমাদের রমজানের অঙ্গীকার।


এ জাতীয় আরো খবর