ঢাকা: ২৩ জুন ২০২৫
দেশে ডেঙ্গু জ্বরের সংক্রমণ ফের উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছাতে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় প্রাণ হারিয়েছেন আরও ২ জন নারী, আর নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৯২ জন রোগী।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সোমবার (২৩ জুন) বিকেলে প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ৩৯২ জন নতুন রোগীর মধ্যে ৩০৬ জনই ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা বরিশাল বিভাগে, যেখানে একদিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১২৬ জন।
এই অঞ্চলে বিগত কয়েকদিন ধরেই বৃষ্টিপাত, জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মারা যাওয়া দুইজনই নারী, যা আবারও ডেঙ্গুতে নারীদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানকে সামনে এনেছে।
চলতি বছর (২০২৫ সালে) এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের, যার মধ্যে পুরুষ ও নারীর সংখ্যা সমান-১৭ জন করে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী- ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৮,১৫০ জন।
এর মধ্যে পুরুষ ৪,৮০৮ জন
নারী ৩,৩৪১ জন
আর ২০২৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১,০১,২১৪ জন,
মৃত্যু হয়েছিল ৫৭৫ জনের,
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন ১,০০,০৪০ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের বছরের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী প্রথম দফা সংক্রমণ বাড়ে জুন-জুলাইয়ে, এবং জুলাই-আগস্টে তা চূড়ান্ত রূপ নেয়।
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আফসানা জামান বলেন, “ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়া মানে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে যাচ্ছে। কারণ এসব অঞ্চলে মশা নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা ঢাকার চেয়ে কম।”
তিনি আরও বলেন, “এখনই যদি স্থানীয় সরকার ও পৌর কর্তৃপক্ষগুলো মশক নিধন কার্যক্রম জোরালো না করে, তাহলে জুলাই-আগস্টে আমরা আবারও মৃত্যু সংখ্যা শতকের ঘরে দেখতে পারি।”
বরিশাল বিভাগে একদিনে ১২৬ জন রোগী শনাক্ত হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন ও জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, “নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলে একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, আর ঘনবসতির মধ্যে ছোট ছোট জলাশয় ও প্লাস্টিক জমে থাকা জায়গাগুলো মশার প্রজননের প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে-
প্রতিটি জেলা শহরে হটস্পট নির্ণয় করে স্প্রে কার্যক্রম চালানো,
পর্যাপ্ত পরীক্ষার কিট সরবরাহ,
এবং জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসা কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা।
জনসাধারণকেও সতর্ক হতে বলা হয়েছে-
জমে থাকা পানি নিয়মিত ফেলা,
ফুলদানিতে, ফ্রিজের নিচে, এসির ট্রেতে পানি জমা না রাখা,
এবং ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ডেঙ্গু এখন আর শুধুমাত্র শহরকেন্দ্রিক সমস্যা নয়। বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক বিস্তার দেখাচ্ছে যে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিতে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনগণের সমন্বিত প্রস্তুতি ছাড়া এই সঙ্কট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
যতটা দ্রুত এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যাবে, ততটাই প্রাণহানি কমিয়ে আনা সম্ভব।
তথ্যসূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশেষজ্ঞ মতামত, বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য।