সিলেট | ১৪ জুন ২০২৫
সিলেটের জাফলংয়ে পাথর কোয়ারি বন্ধের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় জনতা ও পাথর শ্রমিকেরা। এর প্রতিবাদে শনিবার (১৪ জুন) দুপুরে অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের গাড়িবহর আটকে রেখে বিক্ষোভ করেছেন তারা। ঘটনাটি ঘটে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে জাফলং বাজারে, পর্যটন এলাকা ঘুরে ফেরার সময় উপদেষ্টাদের বহর সড়কপথে আটকে দেয় ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।
স্থানীয়রা জানান, জাফলংসহ পুরো সিলেট অঞ্চলের পাথর কোয়ারি স্থায়ীভাবে বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্তে জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজারো শ্রমিক। দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলের লাখো মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছিলেন পাথর উত্তোলন ও ক্রাশিং শিল্পের ওপর নির্ভর করে। সেই শিল্প বন্ধ হয়ে গেলে তাদের বিকল্প নেই বলে দাবি।
উপদেষ্টাদের আগমনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই, স্থানীয় পাথর শ্রমিকদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যুক্ত হন এবং জাফলং বাজার এলাকায় জড়ো হয়ে “কোয়ারি চালু করো”, “ভাত চাই, কাজ চাই” স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন পুরো এলাকা।
গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ সরকার মোহাম্মদ তোফায়েল আহমেদ জানান, “হঠাৎ করেই শ্রমিক ও স্থানীয় জনগণ উপদেষ্টাদের গাড়িবহর ঘিরে ফেলেন। তবে পুলিশের উপস্থিতিতে এবং আলোচনার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।”
সাড়ে ১২টার দিকে উপদেষ্টারা নিরাপদে জাফলং ত্যাগ করে হরিপুর গেস্টহাউজের উদ্দেশে রওনা হন।
জাফলং পরিদর্শনকালে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান স্পষ্ট জানান, “সিলেট অঞ্চলের কোনো পাথর কোয়ারিই আর খুলে দেওয়া হবে না। জাফলং একটি পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ECA)। একে রক্ষা করতেই এই সিদ্ধান্ত। আমরা জাফলংকে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এলাকায় রূপান্তরের কাজ শুরু করেছি।”
তিনি আশ্বাস দেন, “পাথর শ্রমিকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। কেউ যেন বেকার না থাকে, সে চেষ্টাই আমরা করব।”
অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “জাফলংয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের কারণে পরিবেশ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা এসব অবৈধ পাথর ক্রাশারের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
পাথর শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একটাই প্রশ্ন, “আমরা খাবো কী? বিকল্প কর্মসংস্থান না দিয়েই কোয়ারি বন্ধ করা হচ্ছে, এটা কি ন্যায্য?” তাঁরা দাবি করেন, সরকার যদি সত্যিই পরিবেশ রক্ষায় আন্তরিক হয়, তবে আগে বিকল্প জীবনধারার ব্যবস্থা করে পরে কোয়ারি বন্ধ করুক।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক শ্রমিক বলেন, “আমরা চোর নই। আমরা শ্রম দিয়ে পেট চালাই। এখন যদি কোয়ারি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বউ-ছেলেমেয়েকে নিয়ে না খেয়ে মরতে হবে!”
জাফলংয়ের বর্তমান উত্তেজনা কেবল একটি এলাকার সমস্যা নয়, বরং এটি উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার দ্বন্দ্বে বিপর্যস্ত জীবনের প্রতিচ্ছবি। সরকার একদিকে পরিবেশ রক্ষার কথা বলছে, অন্যদিকে স্থানীয় জনতা বাঁচার জন্য রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে।
এই সংকটের সমাধান একমাত্র সম্ভব উভয় পক্ষের অংশগ্রহণে সংলাপ ও বাস্তবভিত্তিক বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগের মাধ্যমে। জাফলং যেন প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে-এটাই এখন সময়ের দাবি।
সকালের আলো ডট কম পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ সমাধান কামনা করে এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে সহনশীলতার সঙ্গে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায়।