৭ জুন ২০২৫
ঈদের আনন্দের ভোরে আনন্দভ্রমণ পরিণত হলো চরম বেদনায়। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বিশনন্দী ফেরিঘাটে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ চার যাত্রী নদীতে পড়ে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় এখনো নিখোঁজ দুই নারী। পরিবারের সবাই ফিরছিলেন গ্রামে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে। কিন্তু সেই আনন্দই রূপ নিয়েছে বিষাদে।
শনিবার, ঈদুল আজহার দিন ভোর ৪টার দিকে ঘটে এই দুর্ঘটনা। ফেরিতে ওঠার পর মাত্র দুই মিনিট পেরোয়নি-হঠাৎ করেই ঢাকার নবাবগঞ্জগামী একটি ফেরি থেকে ছিটকে পড়ে যায় একটি সিএনজি, তাতে থাকা চারজন যাত্রীসহ।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফেরির পাশে কোনো রেলিং ছিল না। সামান্য কাত হয়ে পড়তেই সিএনজি ছিটকে পড়ে। মুহূর্তেই পানিতে তলিয়ে যান চারজন যাত্রী।
নিখোঁজরা হলেন:
খালেদা বেগম (৪০)
ফারজানা বেগম (১৯)
অন্যদিকে উদ্ধার হয়েছেন খালেদা বেগমের ছেলে কামাল হোসেন (১৯) এবং ফারজানার স্বামী সাগর হোসেন। তারা বর্তমানে আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন।
চারজনই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার রসুলবাগ গ্রামের বাসিন্দা। ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছিলেন ঈদ উদযাপন করতে।
দুর্ঘটনার পর পরই ঘটনাস্থলে পৌঁছায় আড়াইহাজার ফায়ার সার্ভিস। ইনচার্জ রবিউল হাসান জানান:
“দ্রুত অভিযান শুরু করা হয়। দুজনকে জীবিত উদ্ধার সম্ভব হলেও দুইজন নারী এখনও নিখোঁজ। নদীর প্রবল স্রোত ও পানির গভীরতা উদ্ধারকাজে জটিলতা তৈরি করছে। আমরা ঢাকার ডুবুরি দলের সহায়তা নিয়েছি।”
এদিকে সকাল থেকেই নদীর তীরে ভিড় করছেন নিখোঁজদের স্বজনরা। অনিশ্চয়তার মাঝে অপেক্ষা, সঙ্গে কান্না ও শোকগাথা-ঘাটজুড়ে এখন এক বিষণ্ন দৃশ্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ দীর্ঘদিনের: বিশনন্দী ফেরিঘাটে নেই কোনো রেলিং, নেই সতর্কীকরণ চিহ্ন, নেই নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা। ফলে মাঝেমধ্যেই ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, যার দায় কেউ নেয় না।
একজন স্থানীয় দোকানি বলেন:
“প্রায়ই দেখি গাড়ি কাত হয়, মানুষের পা পিছলে পড়ে যায়। ফেরির পাশে কোনো ব্যারিকেড না থাকায় ভয় লাগে। আজ ঈদের দিনেই এমন দুর্ঘটনা! কে নেবে এর দায়?”
ঘটনার খবর পেয়ে সকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছান আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাজ্জাত হোসেন। তিনি উদ্ধারকৃতদের খোঁজখবর নেন এবং বলেন:
“এটা অত্যন্ত মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ফেরিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ দুর্ঘটনা কেবল একটি সড়ক বা নদীর ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় অবহেলার এক নগ্ন উদাহরণ। যেখানে সঠিক নজরদারি, নিরাপত্তা ব্যারিকেড বা রেলিং থাকলে চারটি জীবন এমন বিপদের মুখে পড়তো না।
বছরের পর বছর ধরে এমন ঘাটগুলোতে নিরাপত্তা মানা হয় না। ঈদ বা উৎসব এলেই লোকচাপ বাড়ে, কিন্তু বাড়ে না নিরাপত্তা। প্রতি দুর্ঘটনার পর চলে কিছুদিনের ‘তদারকি’ নাটক, তারপর আবার পুরনো চিত্র।
দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত নিখোঁজদের সন্ধানে নদীতে তল্লাশি চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও ডুবুরি দল। নদীর প্রবল স্রোত তাদের কাজে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। নিখোঁজদের স্বজনরা নদীর তীরে অপেক্ষা করছেন, প্রার্থনায় মন দিচ্ছেন-শেষ আশাটুকু যেন বেঁচে থাকে।
নদী-পথে যাত্রী নিরাপত্তা কি শুধুই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ? আমরা কি ঈদের দিনও নাগরিকদের নিরাপদে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা দিতে পারি না? যতদিন ঘাটগুলোতে ন্যূনতম নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না হবে, ততদিন এমন কান্না ফিরে ফিরে আসবে-নতুন নামে, নতুন মুখে।