ঢাকা | ৪ জুন ২০২৫
রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর (আরসিবি) বহু প্রতীক্ষিত প্রথম আইপিএল শিরোপা জয় যেন পরিণত হলো এক ভয়াবহ স্মৃতি ও শোকগাথায়। খেলার মাঠে বিজয়ের উল্লাস ছিল, কিন্তু মাঠের বাইরে ছিল কান্না, বিভ্রান্তি ও মৃত্যুর মিছিল।
মঙ্গলবার রাতে আহমেদাবাদে পাঞ্জাব কিংসকে হারিয়ে ১৮তম আসরে প্রথমবারের মতো আইপিএল চ্যাম্পিয়ন হয় আরসিবি। অধিনায়ক রজত পতিদার ও কোহলি-ম্যাক্সওয়েলদের এই ঐতিহাসিক অর্জন উদযাপন করতে পরদিন বুধবার হাজারো সমর্থক ভিড় করেন বেঙ্গালুরুর এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে। কিন্তু সেই আনন্দ আয়োজনই শেষ পর্যন্ত ছাপিয়ে যায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনায়।
ভারতের জাতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, স্টেডিয়ামের বাইরে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে পদদলিত হয়ে অন্তত ১১ জন মারা গেছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন আরও ৫০ জনের বেশি। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে বেঙ্গালুরু পুলিশ।
ঘটনাটি ঘটে যখন ট্রফি শোভাযাত্রা ও শুভেচ্ছা গ্রহণ অনুষ্ঠান চলছিল মাঠের ভেতরে, আর বাইরে সমর্থকদের জনস্রোত প্রবল হয়ে ওঠে। বাধা পেরিয়ে স্টেডিয়ামে ঢোকার চেষ্টা করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায় ভিড়, আর তখনই ঘটে এই দুর্ঘটনা।
বিশ্লেষক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আরসিবি’র প্রথম শিরোপাজয় যে ধরনের উদ্দীপনা তৈরি করবে, সেটি বিবেচনায় নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন ও আয়োজকরা। অনুমোদিত ধারণক্ষমতার বাইরে অতিরিক্ত ভিড় এবং অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাই তৈরি করেছে এই মর্মান্তিক পরিস্থিতি।
এক প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “মানুষ শুধুই আরসিবিকে একনজর দেখতে চাইছিল। কিন্তু কেউই ভেবেনি ভিড় এতটা ভয়াবহ হয়ে উঠবে।”
ভেতরে যখন অধিনায়ক পতিদার হাতে ট্রফি তুলে ধরছেন, তখন বাইরে প্রিয়জনের নিথর দেহ বহন করে অ্যাম্বুলেন্স ছুটছে হাসপাতালের দিকে। হাসপাতালের করিডোরে কান্নায় ভেঙে পড়া এক তরুণীর মুখে শুধু একটি বাক্য, “আমি ভাইয়ের সঙ্গে খেলা দেখতে এসেছিলাম, এখন একা ফিরছি।”
ঘটনার পর কর্ণাটক রাজ্য সরকার ও বেঙ্গালুরু পুলিশ এরই মধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে ক্ষতিপূরণ ঘোষণার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে অনেকেই দাবি তুলছেন,“এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি অব্যবস্থাপনার ফল।”
ভারতে আইপিএল শুধু ক্রিকেট নয়, এক ধরনের আবেগ, সংস্কৃতি। কিন্তু কোটি টাকার এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে দর্শকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারা কি অমার্জনীয় ব্যর্থতা নয়?
ক্রিকেট বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এমন আনন্দ আয়োজনের আগে জনসমাগম বিশ্লেষণ, ভিড় নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা ও জরুরি প্রস্তুতি আবশ্যক ছিল।
১৮ বছরের অপেক্ষা শেষে ট্রফি উঠেছে বেঙ্গালুরুর মাথায়, কিন্তু সেই আনন্দকে ঘিরে সৃষ্টি হলো এক গভীর মানবিক ট্র্যাজেডি। প্রশ্ন উঠছে, একটা শিরোপা উদযাপনে যদি প্রাণ হারাতে হয় নিরীহ মানুষকে, তাহলে বিজয় কি সত্যিই পূর্ণতা পায়?
খেলাধুলার বিজয় মানবিক মূল্য দিতে গিয়ে যেন আবার প্রমাণ করে দিল, নিরাপত্তা ও মানবিকতা উপেক্ষা করলে উৎসবও রূপ নেয় অনুশোচনায়।