বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০২৬

অবৈধ লেনদেনের প্ল্যাটফর্মে পরিণত মোবাইল ব্যাংকিং:টিআইবির উদ্বেগজনক প্রতিবেদন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৫-২৮ ০১:৪৬:১২
ছবি সংগৃহিত

একসময় শুধুমাত্র আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হাতিয়ার হিসেবে গড়ে ওঠা মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) এখন অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হয়েছে অবৈধ লেনদেন ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অন্যতম মাধ্যম। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে।
মঙ্গলবার (২৭ মে) ঢাকার ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘মোবাইল আর্থিক সেবাখাতে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি ট্রেডিং, অনলাইন জুয়া, ঘুস, সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও মানি লন্ডারিংয়ের মতো অপরাধে এমএফএস ব্যবহার হচ্ছে নিয়মিতভাবেই। বিশেষ করে অনলাইন বেটিং ও জুয়ার জালে ব্যবহৃত হচ্ছে দেশের হাজার হাজার এমএফএস এজেন্ট।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “শুধু আইপিএল বা বিপিএল মৌসুমেই ১,১০০-এর বেশি এমএফএস এজেন্ট জুয়ার লেনদেনে যুক্ত থাকার প্রমাণ মিলেছে। অথচ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্রেফ এসএমএস পাঠিয়ে দায় সারছে।”
গবেষণা বলছে, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত হাজার হাজার গ্রাহক ও এজেন্ট প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
এজেন্টরা ২০০ টাকা থেকে ৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ হারিয়েছেন।
প্রতারণার ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে-
মিথ্যা প্রলোভন ও ভুয়া অফার (৫২.৬%)
ফোনকল বা এসএমএস স্ক্যাম (৪২.১%)
অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং (১২.৩%)
ব্যাংকিংয়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি খরচ

টিআইবি প্রতিবেদনে এমএফএসের ব্যয়বহুলতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। উদাহরণস্বরূপ,
২৫ হাজার টাকা উত্তোলনে ফি গুনতে হয় ২০০–৪৬২ টাকা পর্যন্ত, যেখানে ব্যাংকিং চ্যানেলে খরচ সর্বোচ্চ ২৯ টাকা।
২০২৪ সালে এমএফএস সেবামূল্যে আদায় করা হয়েছে ৪,৪১০ কোটি থেকে ১০,১৯৭ কোটি টাকা পর্যন্ত, যা একই পরিমাণ ব্যাংক লেনদেনের তুলনায় প্রায় ১৫ গুণ বেশি।

টিআইবি এ খাতের অনিয়ম রোধে বেশ কিছু সুপারিশও দিয়েছে, যেমন:
এমএফএস খাতের জন্য আলাদা আইন প্রণয়ন
সব প্রতিষ্ঠানের জন্য আন্তঃলেনদেন বাধ্যতামূলক করা
গ্রাহকের তথ্য নিরাপত্তায় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা
স্বচ্ছ ফি নির্ধারণ নীতিমালা
এজেন্ট নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মানদণ্ড নির্ধারণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে নীতিমালা প্রণয়ন
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে ২০১৯ সালের বিধিমালার সংশোধন

এছাড়া, বিটিআরসি ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে, যেন জুয়া ও বেটিং সাইটে তাদের লোগো ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। গ্রাহকদের জন্য এক বছরের লেনদেন বিবরণী বিনামূল্যে দেওয়ার পাশাপাশি কালো তালিকাভুক্ত গ্রাহকদের তথ্যভান্ডার সবার জন্য উন্মুক্ত করার দিকেও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান বলেন, “এমএফএস খাতে দুর্নীতির শেকড় উপড়ে ফেলতে না পারলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই বিপ্লব আস্থার সংকটে পড়বে।”
টিআইবির ভাষ্যমতে, “যতদিন না পর্যন্ত এই খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও উপযুক্ত নীতিমালা নিশ্চিত হচ্ছে, ততদিন মোবাইল ব্যাংকিং হয়ে থাকবে অর্থনৈতিক অপরাধের সহজ গেটওয়ে।” একদিকে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা, অন্যদিকে অপরাধীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল-এই দ্বৈত চরিত্র মোবাইল আর্থিক সেবা খাতকে নিয়ে যাচ্ছে গভীর অনিশ্চয়তার দিকে।

 


এ জাতীয় আরো খবর