শনিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২৬

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিড়ে নিঃশব্দ সংকট: দেশে বেকার ২৬ লাখ ১০ হাজার, তিন মাসে বেড়েছে ৬০ হাজার

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৫-১৮ ১৯:৪৯:১৬

ঢাকা | ১৮ মে ২০২৫
দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচক যতই ঊর্ধ্বমুখী হোক, কর্মসংস্থানের সংকট যেন ততই ঘনীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সদ্য প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে দেশের বেকার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ১০ হাজারে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৬০ হাজার বেশি।
রোববার (১৮ মে) এই জরিপ প্রকাশ করে বিবিএস।
প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশে, যা আগের তিন মাসের তুলনায় সামান্য ঊর্ধ্বমুখী। এর আগের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রান্তিকে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৫০ হাজার।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বসবাসকারী মাসুদ (২৮) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন দুই বছর আগে। চাকরির জন্য আবেদন করেছেন অন্তত ৪৫টি স্থানে, কিন্তু কোথাও স্থায়ীভাবে সুযোগ পাননি।
“চাকরির বিজ্ঞপ্তি আসে কম, আর আবেদনকারীর সংখ্যা হাজার হাজার। আজকাল আর প্রস্তুতিও নিচ্ছি না। পরিবারের চাপ আর নিজের আত্মবিশ্বাস-দুটোই হারিয়ে যাচ্ছে,” বলেন মাসুদ।
মাসুদের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন নয়। বিবিএসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশেষ করে যুবা (১৫–২৯ বছর) ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেই বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের বড় একটি অংশ শ্রমবাজারে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থানের সমানুপাতিক সুযোগ সৃষ্টি করতে পারছে না। অর্থনীতিবিদ ড. শামসুল আলম বলেন,
“উৎপাদনশীল খাতে শ্রমশক্তির চাহিদা যেমন বাড়েনি, তেমনি প্রযুক্তিনির্ভর ও অটোমেশন নির্ভর অর্থনীতিও কিছু অংশে কর্মসংস্থান সংকুচিত করেছে। বিশেষ করে কৃষিখাতে প্রবেশাধিকার কমছে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা থাকলেও শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মধ্যে যে গ্যাপ, সেটাই প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, শুধু চাকরি খোঁজার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতে এই চিত্র আরও ভয়াবহ হবে। এজন্য প্রয়োজন যৌথভাবে সরকার-বেসরকারি খাতে স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, স্টার্টআপ ফান্ড ও সহজশর্তে ঋণ সুবিধা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি। সামাজিক বাধা, কর্মক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশের অভাব এবং পরিবারিক দায়িত্ব নারীদের কর্মসংস্থান ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করা গেলে জাতীয় অর্থনীতিতে তা বড় অবদান রাখতে পারে।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা বিস্তৃত হলেও তার সঙ্গে মিলছে না বাজারমুখী দক্ষতা। প্রযুক্তি, সেবা ও শিল্প খাতে যে ধরনের কর্মী চাহিদা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পাচ্ছে না তরুণরা। ফলে সার্টিফিকেট থাকলেও কাজ নেই-এই 'ডিগ্রি ও বেকারত্ব'-এর বৈপরীত্য একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

✅ সংক্ষেপে প্রধান তথ্য:
বেকার সংখ্যা (ডিসেম্বর ২০২৪): ২৬,১০,০০০
বৃদ্ধি (৩ মাসে): ৬০,০০০
বেকারত্ব হার: ৪.৪৮%
সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত: যুবা ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী
কর্মসংস্থানে স্থবিরতা: কৃষি খাতে কমছে, সেবা ও শিল্প খাতে সীমিত অগ্রগতি


এ জাতীয় আরো খবর